“অন্ধকারের বিরুদ্ধে এক অনন্য-সাধারণ সংগ্রামী : ভাষাবীর এমএ ওয়াদুদ”

ভাষাবীর এমএ ওয়াদুদের জন্ম চাঁদপুর জেলায় রাঢ়ীরচর গ্রামে। পিতার নাম আব্দুল গফুর। পাকিস্তানের জন্ম থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয় পর্যন্ত এদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্রণী সৈনিক, দৈনিক ইত্তেফাকের জন্মলগ্ন থেকেই তিনি পত্রিকাটির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ইত্তেফাকের অগ্রযাত্রার প্রতিটি স্তরে তার অনস্বীকার্য অবদান রয়েছে।

জনাব ওয়াদুদ ইত্তেফাকের কর্মাধ্যক্ষ পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। কর্মজীবনে ইত্তেফাক ছাড়াও ঈগল বক্স ও বাংলাদেশ পেপার মিলসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং স্টার পাটিক্যালসের পরিচালক পদেও কাজ করেন। সঙ্কটময় সময়ে ছাত্রলীগের সফল নেতৃত্ব দিয়ে তিনি, অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অংশ গ্রহণ এমএ ওয়াদুদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি।

এমএ ওয়াদুদ ১৯৫৩-৫৪ সালে প্রাদেশিক ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। দু’বার নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও একবার প্রাদেশিক ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদকের দায়িত্বও তিনি নিষ্ঠা ও সাফল্যের সঙ্গে পালন করেন। আওয়ামী লীগের তিনি একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে দেওয়ার কারণে ১৯৪৮ সালে একবার এবং ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত দ্বিতীয়বার কারাবরণ করেন। ১৯৫৪ সালে ৯২ (ক) ধারা জারি করে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত করার পর ছাত্র আন্দোলনের স্তিমিত করার উদ্দেশ্যে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার পুরনরায় এমএ ওয়াদুদকে কারারুদ্ধ করে। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্বে দেওয়ার কারণে তৎকালীন শাসকদের রুদ্ররোষের শিকার হয়ে দীর্ঘদিন আত্মগোপন করতে বাধ্য হন তিনি। একই বছর চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আন্দোলন ও ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে দেওয়ার কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে জনাব এমএ ওয়াদুদও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে বিহিস্কৃত হন।

গত ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারী পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকার পল্টন ময়দানের এক জনসভায় উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার ঘোষণা দিলে আন্দোলন আবারও চাঙ্গা হয়। ওই ঘোষণার প্রতিবাদে ইত্তেফাক পত্রিকায় তীব্র সমালোচনা করে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রদের এক প্রতিবার সভা অনুষ্ঠিত হয় ২৯ জানুয়ারি। জানুয়ারি ৩০ ছাত্ররা প্রতীক ধর্মঘট পালন করে এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ছাত্র ধর্মঘট এবং ২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল আহব্বান করে ।

এ সময় জনাব এমএ ওয়াদুদ ভাষা আন্দোলনের সপক্ষে ইত্তেফাক পত্রিকায় লেখালেখিসহ আন্দোলনের নানা কর্মসূতিতে সক্রিভাবে অংশ গ্রহণ করেছিলেণ। ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় এক ঐতিহাসিক সভা। ওই সময় গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষ।

এর আহবায়ক নিযুক্ত হন তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেত কাজী গোলাম মাহবুব। বিভিন্ন হল ও সংগঠনের নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত হয় এই পরিষদ। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে এ পরিষদ ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে। গঠিত সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের সদস্য মনোনীত হন এমএ ওয়াদুদ। তখনকার সময়ে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের একজন নিবেদিত প্রাণ এবং গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবেই তাকে সংগ্রাম পরিষদের সদস্য করা হয়। কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদ ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ এর ছাত্র ধর্মঘট এবং ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ এর হরতালকে সমর্থন করে পরবর্তী আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে।

২০ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের ব্যাপকতার মুখে সরকার ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করেন। ১৪৪ ধারা জারির প্রেক্ষিতে ২১ ফেব্রুয়ারি কর্মসূচির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহনের জন্য ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ৯৪ নবাবপুর রোডে আওয়মী লীগ অফিসে সংগ্রাম পরিষদের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

ওই বৈঠকে ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে বিপক্ষে ভোট গ্রহণ করা হলে বেশিরভাগ সদস্য ১৪৪ ধারা ভাঙার বিপক্ষে ভোট প্রদান করেন। তারপর ছাত্র সমাজের মধ্যে শুরু হয়ে যায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও উত্তেজনা। একুশের হত্যকান্ডের পর সরকারের চরম দমননীতি ও নির্যাতনের শিকার হন জনাব ওয়াদুদ।

আন্দোলনের কর্মীদের ওপর গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করা হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে ৯৪ নবাবপুর রোডস্থ আওয়ামী লীগ মুসলিম লীগ অফিসে,১৫০ মোগলটুলিস্থ পূর্ববঙ্গ কর্মশিবির অফিসে, যুবলীগের অফিসে এবং এমএ ওয়াদুদের বাসায় পুলিশ হানা দিয়ে তছনছ, ছিন্নভিন্ন করে। এ সময়ের ছাত্র যুবদলনেতা এমএ ওয়াদুদ ১০৪ ডিগ্রি জ¦রে আক্রান্ত থাকা সত্ত্বেও পুলিশ ৫৫ নম্বর কলটোলার বাসা থেকে সে রাতে তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। একুশে ফেব্রুয়ারি পরবর্তী পর্যায়ের আন্দোলনেও জনাব ওয়াদুদ বাংলা ভাষা প্রচলন ও একুশের চেতনা বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৫৩ সালে প্রথম শহিদ দিবস উদ্যাপনে তিনি ছিলেন বেশ সক্রিয়। প্রথম শহিদ দিবসের অর্থাৎ ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরের সর্বস্তরের জনতা বিশেষ করে মহিলারা নগ্নপদে ও সুনিয়ন্ত্রিভাবে পরিচালিত দীর্ঘ শোভাযাত্রা সহকারে শহর প্রদক্ষিণ করেন।”শোভাযাত্রার অংশ গ্রহণকারীরা রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই প্রভৃতি শ্লোগানে শহর মুখরিত করে তোলে। দুপুর ১২ টায় “শোভাযাত্রার অংশগ্রহণকারীগণ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমবেত হন এবং বিকেলে আরমানিটোলা মাঠে অনুষ্ঠিত সমাবেশে যোগদান করেন।

ওই শোভাযাত্রা পরিচালনা করেন জনাব এমএ ওয়াদুদ এ প্রসঙ্গে ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ তারিখে পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে করা হয় শোভাযাত্রার পুরোভাগ সাইকেল আরোহী দল এবং তাহার পশ্চাতে ছিলেন শহিদ দিবস আবহ্বানকারী দলের নেতৃত্বস্থনীয় ব্যক্তিবর্গ, যাদের মধ্যে জনাব আতাউর রহমান,কাজী গোলাম মাহবুব ও এমএ ওয়াদুদ ছিলেন।

জনাব ওয়াদুদই শোভাযাত্রা পরিচালন করেন। শোভাযাত্রা শেষে আরমানিটোলা ময়দানে আতউর রহমান খানের সভাপতিত্বে এক বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় যেসব নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কাজী গোলাম মাহবুব, মাহমুদ আলী, হালিমা খাতুনসহ আরও অনেকে । জনাব এমএ ওয়াদুদ এই সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন। মহান ভাষা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার স্বীকৃতি স্বরূপ ভাষাবীর এম এ ওয়াদুদকে ২০১৩ সালে সরকার মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করেন।

গত ১৯৭৮ সালে সামরিক সরকারের সঙ্গে হাত মলিয়ে মন্ত্রিত্ব গ্রহণ অস্বীকৃতি জানানোর জন্য জনাব এম এ ওয়াদুদকে করাবরণ করতে হয়। সামরিক শাসনের সময়ে তার বিরুদ্ধে বারবার মিথ্যা মামলা দায়ের করে হয়রানি করা হয়। এমএ ওয়াদুদ ১৯৮৩ সালে ২৮ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। চাঁদপুর নির্বাচন সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সফল প্রথম নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বর্তমানেও সফল প্রথম নারী শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি আপা (উরঢ়ঁ গড়হর) তার একমাত্র কন্যা এবং ডায়াবেটিক ফুট সার্জারিতে দেশের একমাত্র বিশেষজ্ঞ শল্য চিকিৎসাক ডা: জে আর ওয়াদুদু টিপু ভাই তার একমাত্র পুত্র। ভাষাবীর এমএ ওয়াদুদ বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি ।

একই রকম খবর