আজ চাঁদপুর মুক্ত দিবস

চাঁদপুর খবর রিপোর্ট : আজ ৮ ডিসেম্বর শনিবার চাঁদপুর মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এ দিনে চাঁদপুর পাক হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্তি পেয়েছিল। চাঁদপুর থানার সামনে বিএলএফ বাহিনীর প্রধান মরহুম রবিউল আউয়াল কিরণ প্রথম চাঁদপুরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন।

১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল চাঁদপুরে পাক হানাদার বাহিনী দুটি বিমান থেকে সেলিং এর মাধ্যমে প্রথম আক্রমনের সূচনা করে। প্রথম দিনেই হামলায় চাঁদপুর শহরের পুরান বাজারের একজন নারী পথচারী নিহত হন। পর দিন ৮ এপ্রিল বিকেলে প্রায় ৫শ পাকসেনা বোঝাই একটি বহর চাঁদপুর আসে।

শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে চাঁদপুর কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়টি অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করে তারা। এ স্কুলের মাঠ থেকে প্রতিদিনের ন্যয় লতুফা বেগম নামে এক বৃদ্ধা গরু-ছাগল বাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় পাক বাহিনীর সদস্যরা রাতের খাবার জোগাড় করার জন্যে প্রথম অপারেশন হিসেবে ওই বৃদ্ধাকে গুলি করে হত্যা করে এবং বৃদ্ধার একটি গরু ও একটি ছাগল নিয়ে তারা রাতের খাবার খান। আর পাক সেনাদের অফিসারদের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেষ্টহাউজটি নির্ধারণ করা হয়েছিলো।

নিহত লতুফা বেগমের নাতী মো. সিরাজ মৃধা জানান, তার দাদীকে প্রকাশ্যে হত্যা করে পাক হানাদার বাহিনী গুরু-ছাগল নিয়ে যায়। সে দূর থেকে দেখলেও কিছুই করতে পারেনি। ওই ক্ষোভ এখনো তার মনে রয়েছে।

কারিগীর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের বর্বরতম হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী তরপুরুচন্ডী গ্রামের বাসিন্দা মো. নান্নু মিজি জানান, তিনি এবং তার বড় ভাইকে সন্ধ্যার দিকে এনে কবর খুড়ার জন্য নির্দেশ করে। তখন তারা বাড়িতে যাবে বলে জানালে তাদেরকে বেধম পিটিয়ে আহত করে এবং জোর পূর্বক তাদেরকে দিয়ে ৩টি কবর খুড়ে। ওই কবরই মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত ৩ জন পাক সেনা সদস্যকে স্কুলের পিছনে কবর দেয়া হয়।

৮ এপ্রিল রাতেই চাঁদপুরে অবস্থানরত ২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা বিচ্ছিন্নভাবে পাকহানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালান। হামলা দেখে পাক হানাদার বাহিনীরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। তখন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা মারাত্মক আহত হন। ৯ এপ্রিল পাকবাহিনী ভোরে শহরে ঢুকে চাঁদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ইসমাইল হোসেন ভলন্টিয়ার (৫৫) নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে। একই সাথে তারা শহরের হাসান আলী হাই স্কুলের মোড়ে আপাক ও মাখন নামে দুইজন যুবককে সাইকেলে চালাতে দেখে গুলি করে হত্যা করে।

এরপরেই তারা শুরু করে তাদের মূল অপারেশন কার্যক্রম। এ জন্য চাঁদপুর বড়স্টেশন মোলহেড এলাকায় হানাদার বাহিনীর একটি টর্সার সেল গঠন করে। এখানে চাঁদপুর রেলপথ, সড়ক পথ এবং নৌ-পথে যে সকল যাত্রীদের সন্দেহ হয়েছে, সেসকল নারী-পুরুষকে এনে অমানবিক নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ করেছে। পরে এই লাশগুরো মেঘনা এবং পদ্মা নদীতে ফেলে দিয়েছে। যার স্বাক্ষী হিসেবে আজও পদ্মা-মেঘনা নদী বহন করে।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার্থে চাঁদপুর পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ২০১৩ সালে বড় স্টেশনের বদ্ধভূমিতে নির্মাণ করা হয় ‘রক্তধারা’। এরপূর্বে চাঁদপুরের প্রথম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সুশীল, সংকর ও খালেক এর নামে ট্রাক রোডে নির্মাণ করা হয় ‘মুক্তিসৌধ’ এবং চাঁদপুর শহরের প্রাণ কেন্দ্রে লেকের উপর দৃশ্যত ভাসমান মুক্তিস্মৃতি সৌধ ‘অঙ্গীকার’ নির্মাণ করা হয়।

চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সম্মুখে এ জেলায় স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের নামের তালিকা সম্বলিত একটি স্মৃতি ফলক নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও চাঁদপুর পৌরসভার ৫ রাস্তার মোড়ে পৌরসভার অর্থায়নে নির্মাণ করা হয় ‘শপথ চত্বর’।

এপ্রিল থেকে হানাদারবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের চলে দফায় দফায় গোলাগুলি। পরে গঠন করা হয় শান্তিবাহিনী। তারপর নতুন কায়দায় শান্তিবাহিনী ও পাকবাহিনী বিভিন্ন জায়গায় চালাতে থাকে বর্বর অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ। ৩৬ ঘণ্টা যুদ্ধের পর পালিয়ে যায় তারা ।

এভাবে ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানের দোষররা কতো লোককে হত্যা করেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তৎকালীন চাঁদপুর মহকুমা জেলায় সর্বশেষ যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল ৭ ডিসেম্বর লাকসাম ও মুদাফ্ফরগঞ্জ মুক্ত হওয়ার পর। যৌথ বাহিনী হাজীগঞ্জ দিয়ে ৬ ডিসেম্বর চাঁদপুর আসতে থাকলে মুক্তিসেনা কর্তৃক হানাদার বাহিনী প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়।

ভারতের মাউন্টেন ব্রিগেডও ইস্টার্ন সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের যৌথ আক্রমন চালায় । দিশে না পেয়ে পাকিস্তান ৩৯ অস্থায়ী ডিভিশনের কমান্ডিং অফিসার মেজর জেনারেল রহিম খানের নেতৃত্বে দু’টি জাহাজে করে নৌ-পথে ঢাকার উদ্দেশ্যে চাঁদপুর থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর ট্যাংক ও বিমান আক্রমনে চির কবর রচনা হয় নাদীতে।

একই রকম খবর

Leave a Comment