ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপযুক্ত করে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের

:অধ্যক্ষ প্রফেসর অসিত বরণ দাশ :

শিক্ষকতাকে উপভোগ করি। নিজ মেধার বিচরণ করছি চাঁদপুর সরকারি কলেজের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের মাঝে। এ কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করে চাঁদপুরের ছাত্রছাত্রীদের মাঝে অর্জিত মেধা বিলাতে চেষ্টা করি। দিন দিন আরো শিখি এবং তা থেকে শেখাই। একই বিভাগে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বও পালন করি। বর্তমানে এ কলেজেরই অধ্যক্ষ পদে দায়িত্বরত আছি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আমি এ কলেজেরই ছাত্র ছিলাম।

চাঁদপুরের সন্তান ও চাঁদপুরের সবচেয়ে বড় বিদ্যাপিঠের ছাত্র, শিক্ষক সর্বশেষ অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছি। তাই নিজ জেলার ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ভাবি। তাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করি। তাদের লেখাপড়ার মান বাড়ানো নিয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরী করি।

কিভাবে পড়াশোনা করলে, কোথায় পড়লে চাঁদপুরের বর্তমান ছাত্রছাত্রীরা আগামীর রাষ্ট্র নায়ক কিংবা দেশ পরিচালনায় বড় বড় পদে আশিন হবে, এমন সব পরিকল্পনা নিয়ে সারাদিন জপি। কলেজ কিংবা বাসা, দিন কিংবা রাত- কোন দিকেই তাকাই না, মাথায় একটা বিষয়ই কাজ করে আর তা হলো চাঁদপুরের শিক্ষার্থীদের মাঝে নিজেকে খুঁজে পাই।

এমন সব ভাবনা থেকেই সদ্য মাধ্যমিক পাশ বা উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি প্রার্থী ছাত্রছাত্রীদের জন্য কিছু কর্মপরিকল্পনা তৈরী করেছি। এ কর্মপরিকল্পনার শতভাগ বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে আমার কলেজের শিক্ষকদের নিয়ে একাধিক সভা ও টিম তৈরী করেছি। আমাদের শিক্ষকরা মুখিয়ে আছে তা বাস্তায়নের জন্য। আমরা কাংখিত ছাত্রছাত্রী ফেলে তাদেরকে ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপযুক্ত করে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের।

একটা বিষয় আমাকে খুব ভাবায়। সেটি হলো মাধ্যমিক পাশ করার পর চাঁদপুরের মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা চাঁদপুরের বাহিরে বিশেষ করে ঢাকা বা অন্য জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলে যায়। এক্ষেত্রে অভিভাবকরাও উদাসীন। এটা খুবই দুঃখজনক।

অন্যদিকে চাঁদপুর শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী ও মফস্বলের শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়। এদেরকেই ঘষেমেজে আমরা তৈরী করে আসছি। অথচ আমাদের মেধাবীদের যদি আমরা একটু ঘষামাজা করতে পারতাম, তাহলে তাদেরকে উচ্চ শিক্ষায় ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তিসহ আমাদের প্রতিষ্ঠানকেই আমরা দেশসেরা প্রতিষ্ঠানে রুপ দিতে পারতাম। আমাদের সেই সামর্থও রয়েছে। আমি একটা উদাহরণ দিই- সর্বশেষ মেডিকেল ভর্তির ফলাফলের দিন রাতে ময়মনসিংহের সরকারি মুমিনুন্নেছা মহিলা কলেজের একজন শিক্ষকের ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে আমি অভিভূত। তিনি তাদের সকল ছাত্রছাত্রীর তথ্য সংগ্রহ না করেও তাৎক্ষণিক যতটুকু জানলেন তা থেকে ১৭ জনের মেডিকেল ভর্তিযোগ্য স্ট্যাটাসে আত্মতুষ্টি জানালেন।

এমন খবর নিঃসন্দেহে আনন্দের। সেটি তো ঢাকার কোন কোন কলেজ নয়! সেটিও চাঁদপুরের মতই মফস্বল শহরের। তারা পারলে আমরা কেন পারবো না? আমি গর্ব করে বলবো আমাদের শিক্ষকরা শিক্ষাদানে অন্যদের তুলনায় কম নয়, অধিকাংশে বেশিও বটে। আমাদের মেধাবী ছেলেমেয়েরা চাঁদপুরে ভর্তি হলে আমরা আরো ভালো ফলাফলের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে বদ্ধ পরিকর।

আবার যদি রাজধানীর ভিকারুননিসা, নটরডেম, ঢাকা কলেজ কিংবা অন্য কলেজের কথা চিন্তা করি- তাহলে দেখা যাবে এ সকল প্রতিষ্ঠানে যদি ১০০ জন মেধাবী ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়, তাদের সবাই তো আর মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না। অথচ তাদের ১০০ তম মেধাবীর চেয়েও কম মেধাবী ছাত্রছাত্রীকে আমরা ঘষামাজা করে মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির উপযুক্ত করে দিচ্ছি।

চাঁদপুরকে নিয়ে আমরা গর্ব করি। আমাদের বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি চাঁদপুরেরই সন্তান। চাঁদপুর-৩ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য। তিনিও দিন-রাত ২৪ ঘন্টা চাঁদপুরকে নিয়ে ভাবেন। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি ইতোমধ্যে চাঁদপুরে মেডিকেল কলেজ করেছেন। চাঁদপুরের জন্যে ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় বিলও ইতোমধ্যে পাস করিয়েছেন, তা এখন নির্মাণের অপেক্ষায় রয়েছে।

এছাড়াও চাঁদপুরের ছাত্রছাত্রী ও তাদের শিক্ষার মানোন্নয়নের কথা চিন্তা করে শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মানোন্নয়নে পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। আমরাও শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে চলছি।

আগামীকাল হতে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির আবেদন শুরু হচ্ছে। মাধ্যমিক পাশ করা ছাত্রছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদের অনুরোধ করবো কোন শিক্ষার্থীই যেন চাঁদপুরের বাহিরে না যায়। বিশেষ করে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের অনুরোধ করবো তোমরা চাঁদপুরেই ভর্তি হও। তোমাদেরকে ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপযুক্ত করে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের।

অভিভাবকদের বলবো একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন- কুমিল্লা, বরিশাল, ময়মনসিংহ কিংবা অন্য মফস্বল জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে আমাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান অনেক ভালো। তাহলে কেন আপনাদের কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের চাঁদপুরে পড়াবেন না? আমরা কথা দিচ্ছি মেধাবী ছাত্রছাত্রীদেরকে ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপযুক্ত করে গড়ে তোলবো। অভিভাবকদের দায়িত্ব ছাত্রছাত্রীদেরকে আমাদের কাছে পাঠানো, আর আমাদের দায়িত্ব তাদেরকে ভালো কিছু দেওয়ার। এক্ষেত্রে চাঁদপুরের প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই বদ্ধ পরিকর।

আমি যদি আমার কলেজের কথা অর্থাৎ চাঁদপুর সরকারি কলেজের কথা বলি, তাহলে বলবো- এখানে আমরা বর্তমানে ৮৫ জন শিক্ষক রয়েছি। আমাদের শিক্ষকরা কর্মঠ, সৃজনশীল ও অত্যন্ত মেধাবী। আমাদের আরো বেশ কয়েকজন শিক্ষক আসার সম্ভাবনাও আছে। বর্তমানে একাদশ-দ্বাদশের যে ব্যাচ আছে তাদেরকে যথেষ্ট পরিমানে নার্সিং করেছি এবং করছি।

আগামী সেশনে যারা ভর্তি হবে তাদের জন্যেও রয়েছে আমাদের নতুন কর্মপরিকল্পনা। আমরা একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর জন্য শহীদ রাজু ভবনটিতে ছাত্রদের জন্য আলাদা এবং ছাত্রীদের জন্য আলাদা ক্লাস রুমের ব্যবস্থা রেখেছে। রয়েছে আলাদা আলাদা কমনরুম ও ক্যান্টিন ব্যবস্থা। প্রতি ২০-২৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য আমরা ক্লাসের বাহিরেও অতিরিক্ত শিক্ষককে দায়িত্ব দিয়েছি। যারা নিয়মিত ছাত্রছাত্রীদের খোঁজ-খবর রাখবে এবং অভিভাবকদের সাথে তাদের সন্তানের পড়াশোনার বিষয়ে আপডেট তথ্য আদান-প্রদান করবে। আমাদের লক্ষ চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকেই বের হয়ে আসবে অন্য জেলার চেয়ে অধিক পরিমানে ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির উপযুক্ত শিক্ষার্থী। আগেও আমাদের শিক্ষার্থীরা এ সব উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছে।

আমরা এর হার কয়েকগুণ বাড়াতে চাই। এজন্যে যত ধরনের কর্মপরিকল্পনা দরকার, আমরা তা করবো। প্রয়োজনে এইচএসসি পরবর্তী উচ্চ শিক্ষায় ভর্তির পূর্ব পর্যন্ত আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের নার্সিং করবো। তারপরেও অভিভাবকদের বলবো আপনাদের মেধাবী সন্তানকে আমাদের কাছে দিন। তাদের গড়ে তোলার বাকী দায়িত্ব আমরা নিবো। আমাদের প্রতিষ্ঠানটি দেশের প্রথম সারির মধ্যে একটি। আমাদের কলেজে অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষার্থীরা তাদের ফলাফলে দেশ সেরা হওয়ারও গৌরব অর্জন করে চলছে। আমরা এই ধারা অব্যাহত রেখে এগিয়ে যেতে চাই। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রচেষ্টায় উচ্চ মাধ্যমিকেও আমরা সেরা হওয়ার সক্ষমতা রাখি।

সর্বোপরি আসুন আমরা সবাই মিলে চাঁদপুরের শিক্ষা ব্যবস্থার গুনগত মান উন্নয়নে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করি।

অনুলিখন :
এইচএম জাকির
সংগঠক ও সমাজকর্মী

একই রকম খবর