ঈদুল আযহার গুরুত্ব, করণীয় ও বর্জনীয়

…………….মাও. মো. জাফর আলী…………

পৃথিবীর সকল জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের মানুষের জন্য আনন্দ উদযাপনের বিভিন্ন দিবস রয়েছে। মুসলমান জাতির জন্যও নির্দিষ্ট আনন্দের দিনের মধ্যে ঈদ অন্যতম। হাদীস শরীফে রয়েছে, প্রত্যেক জাতিরই একটা আনন্দের দিন রয়েছে আর এটি হল আমাদের আনন্দের (ঈদের) দিন। (সহীহ বুখারী: ৯৫২, সহীহ মুসলিম: ২০৯৮)।

ঈদ অর্থ খুশি, আনন্দ, প্রত্যাবর্তন, ফিরে আসা, বার বার আগমন ইত্যাদি। যেহেতু দিনটি প্রতি বছরই খুশি ও আনন্দের বার্তা নিয়ে আমাদের মাঝে আগমন করে, তাই দিনটিকে ‘ঈদ’ নামে নামকরণ করা হয়। ঈদ ঐ দিনকে বলে, যে দিন বছরে দু‘বার ফিরে আসে, যাতে মুসলমানরা আনন্দ ও উৎসব পালন করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিশেষ ধরনের সালাত আদায় করে। (মু‘জামুল অসীত)।

আযহা অর্থ দ্বিপ্রহর অর্থাৎ সকাল ও দুপুরের মধ্যবর্তী সময়। ঈদুল আযহা অথর্, অর্ধ-দুপুরের আনন্দ। এ দিনটিকে ইয়াওমুন নাহার বা রক্ত প্রবাহের দিন, ইয়াওমুয যাবাহ বা পশু যবেহের দিন ও ইয়াওমুন নুসুক বা কুরবানীর দিনও বলা হয়। এ দিনটির যথেষ্ট গুরুত্ব এবং মুসলমানের জন্য করণীয় ও বর্জনীয় কিছু কাজ রয়েছে।

ঈদুল আযহাকে ইয়াওমুল হাজ্জিল আকবার বা শ্রেষ্ঠ হজ্জের দিন বলা হয়। যে দিনে হাজী সাহেবগণ তাদের পশু যবেহ করে হজ্জকে পূর্ণ করেন। ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত , রাসূলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজ্জে নহরের (কুরবানীর) দিন কংকর নিক্ষেপের স্থানে অবস্থান করেন। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এটা কোন দিন? সাহাবায়ে কেরামগণ (রা.) উত্তর দিলেন, এটা ইয়াওমুন নাহার বা কুরবানীর দিন। রাসূলে করীম (সা.) বললেন, এটা হল ইয়াওমুল হাজ্জিল আকবার বা শ্রেষ্ঠ হজ্জের দিন। (সুনান আবূ দাঊদ: ১৯৪৫)।

ঈদুল আযহার দিনটি বছরের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে পরিগণিত। আব্দুল্লাহ্ ইবন কুরত (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলে করীম (সা.) বলেছেন, আল্লাহর নিকট দিবসসমূহের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন হল কুরবানীর (নাহরের) দিন, তারপর পরবর্তী দিন (কুরবানীর দ্বিতীয় দিন)। (সুনান আবূ দাঊদ: ১৭৬৫)।
ঈদুল আযহার দিনটি ঈদুল ফিতরের চেয়েও শ্রেষ্ঠ দিন। কারণ এ দিনে সালাত ও কুরবানী একত্রিত হয়। যা ঈদুল ফিতরের সালাত ও সদাকাতুল ফিতরের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। (লাতায়েফুল মা‘আরিফ: ৪৮২-৪৮৩ পৃ.)।

ঈদুল আযহার ধর্মীয় গুরুত্ব অপরিসীম। এর মাধ্যমে মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আ.)- এর ন্যায় আল্লাহ তা‘আলার প্রতি আবেগ, অনুভূতি, প্রেম-ভালোবাসা ও ঐকান্তিকতা নিয়ে কুরবানী করার শিক্ষা নেয়া যায়।

এ দিনে আল্লাহর পথে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়ার দৃপ্ত শপথ নিতে হবে। সূফীদের মতে, পশুর গলায় ছুরি চালানোর সাথে সাথে নিজের কুপ্রবৃত্তির মূলে তথা মানব মনের কুফর-শিরক, লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ, রিয়া, পরনিন্দা, অহংকার, আত্মগর্ব, কৃপণতা, ধনলিপ্সা, প্রভুত্ব-প্রিয়তা, সম্মান কামনা, দুনিয়ার মায়া-মহব্বত এবং আরো অসংখ্য পাপ-পঙ্কিলতার কেন্দ্রমূলেও ছুরি চালাতে হবে। মহানবী (সা.)- এর সুন্নাত পালনপূর্বক ধর্মের প্রতি আনুগত্যের সাক্ষ্য দেয়ার দীক্ষা নেয়ার উপযুক্ত সময় এটি। হাজীগণের মিনায় কুরবানী করার সাথে সাদৃশ্য বজায় রেখে ইসলামী ঐতিহ্য রক্ষার শিক্ষা নেয়া যায় এই পবিত্র দিনে।

ঈদুল আযহার সামাজিক গুরুত্বও কোন অংশে কম নয়। এ দিনের কার্যাবলী পালনের মাধ্যমে ইসলামী সংস্কৃতি রক্ষা করে অনৈসলামী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থেকে মুসলিম উম্মাহকে রক্ষা করা যায়। এর মাধ্যমে সামাজিক সাম্য, ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখা যায়। ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমিয়ে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা এনে সুখী ও সমৃদ্ধশালী সমাজ গঠন করা যায়। আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় করে দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মনিয়োগ করার মোক্ষম উপায় এ পবিত্র দিনের পর্ব পালনে নিহিত রয়েছে।

ঈদুল আযহায় মুসলমানের জন্য করণীয়: ঈদের দিনে তাকবীরে তাশরীক পাঠের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলাকে বেশি বেশি স্মরণ করা। হাটে-বাজারে , মসজিদে-মাঠে, বাড়িতে-ঘরে সর্বত্র তাকবীর পাঠে রত থাকা। পুরুষেরা উঁচু আওয়াজে এবং মেয়েরা নিরবে তাকবীর পাঠ করবে। মূলতঃ এ তাকবীর “আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহি হাম্দ” জিলহজ্জ মাসের মাসের এক তারিখ হতে ১৩ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত পাঠ করার সময়। (ফাতহুল বারী: ২/৫৮৯, সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ্: ১/৬০৩ পৃ.)।

 সুন্নাত পদ্ধতিতে গোসল করে পবিত্র ও পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা। (মুয়াত্তা মালিক: ৪২৬)। এরপর সম্ভব অনুযায়ী সুন্দর ও মার্জিত পোশাক পরিধান করা। (সহীহাহ্:১২৭৯)।

সকাল বেলা কিছু না খেয়ে ঈদগাহে যাবে, অতঃপর ঈদের সালাত শেষে ফিরে এসে কুরবানীর গোশত খাবে। (জামি আত-তিরমিযী:৫৪২)। ঈদুল আযহায় না খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া রাসূলের (সা.) সুন্নাত, যা ধনী-গরীব সকলের জন্য প্রযোজ্য। তবে এ কিছুক্ষণ না খেয়ে থাকাকে রোযা বলা অনুচিত, কারণ ঈদের দিন রোযা রাখা হারাম।

 ঈদগাহে এক পথ দিয়ে যাওয়া ও অপর পথ দিয়ে ফেরা সুন্নাত। (সহীহ বুখারী: ৯৮৬) । সম্ভব হলে ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া সুন্নাত। (সহীহ ইবনু মাজাহ:১০৭১)। ঈদগাহে পৌঁছে অপেক্ষারত মুসল্লীগণ তাকবীর পাঠে রত থাকবেন।

ঈদের সালাতের আগে ও পরে কোন সুন্নাত/নফল সালাত নেই। (সহীহ বুখারী:৯৮৯)। ঈদের সালাতে আযান ও ইকামত নেই। (সহীহ মুসলিম:৮৮৭)।

 ঈদের সালাত শেষ করে সামর্থ্যবান ব্যক্তিগণ আল্লাহর নামে ও তাঁর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানী করবেন। একাকী কুরবানী করার সামর্থ্য না থাকলে একটি গরুতে সাত শরীকে কুরবানী দিবে। (সহীহ মুসলিম:১৩১৮)।

কুরবানী করার পর নিজে খাবে, প্রতিবেশীদের খাওয়াবে এবং অসহায় দরিদ্রদেরকে দান করবে। সাধারণত এ তিন শ্রেণি হকদার। সুতরাং কাউকে বঞ্চিত করবে না। (সূরা হাজ্জ:২৮ ও ৩৭, সহীহ বুখারী: ৫৫৭০, সহীহ মুসলিম: ১৯৭১)। কুরবানীর চামড়া বা বিক্রয় লদ্ধ অর্থ দরিদ্র ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানে দান করে দিবে। (সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ্: ২/৩৭৯ পৃ.)।

ঈদের দিন পূর্ণভাবে আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্যের মাঝে অতিবাহিত করতে হবে। পরস্পরে সালাম ও শুভেচ্ছা বিনিময় করা উচিত। সাহাবায়ে কিরাম (রা.) পরস্পরে হাসি মুখে সাক্ষাৎ করতেন এবং বলতেন, “তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম” তথা আল্লাহ আমাদের এবং আপনাদের আমল সমূহ কবূল করুন। এর মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় করা সুন্নাতে সাহাবা। সুতরাং বিভিন্ন পরিভাষা ব্যবহার না করে সেরূপ পরিভাষা সালাম ও শুভেচ্ছা বিনিময় করা উচিত। (সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ্: ১/৬০৮)।
ঈদুল আযহার দিনে বর্জনী বিষয় সমূহ:

 প্রথমে ঈদের সালাত আদায় করতে হবে। অতঃপর খুতবা প্রদান করতে হবে। সুতরাং সালাতের আগে খুতবা দেয়া যেমন নিষিদ্ধ তেমনি একাধিক খতীব হওয়াও নিষিদ্ধ।

 কুরবানীর গোশত বিক্রয় করা যাবে না। অর্থাৎ বিক্রয় করে নিজে উপকৃত হওয়া যাবে না। এমনকি কসাইকে পারিশ্রমিক স্বরূপ গোশত দেয়াও নিষিদ্ধ। (সহীহ বুখারী: ১৭১৭, সহীহ মুসলিম: ১৩১৭)। তবে সাধারণভাবে তাকে খাওয়ার জন্য হাদিয়া স্বরূপ গোশত দেয়াতে কোন অসুবিধা নেই।
ক্স আমরা সম্ভ্রান্ত মুসলিম জাতি। আমাদের আকীদা-বিশ্বাস, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও আদর্শের মূলভিত্তি হচ্ছে তাওহীদ এবং সুন্নাতে রাসূল (সা.)। আমাদের আদর্শ সর্ব প্রকার অশ্লীল হাসি-তামাশা, বেহুদা কর্মকা- ও অনৈসলামী কার্যক্রম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বৈশিষ্ট্যম-িত। যেমন- আল্লাহ তা‘আলার বাণী, “আর তারা (মুমিনগণ) অনর্থ কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকে”। (সূরা আল মু‘মিনুন:৩)।

 ঈদের দিন উপলক্ষে কোথাও ‘ঈদমেলা’ আয়োজিত হয়। যেখানে অবাধে নারী-পুরুষের বিচরণসহ নাচ-গান বা আড্ডার আয়োজন চলে। এ সকল অনুষ্ঠানের আয়োজন ও এতে অংশগ্রহণ বা সহযোগিতা করা সম্পূর্ণ হারাম। অনুরূপ ঈদ উপলক্ষে বাড়ী-ঘর বা দোকানে-রাস্তায় গান-বাজনার বিশেষ আয়োজন, নারী-পুরুষের বিশেষ সাক্ষাৎ ও অবাধে যেখানে-সেখানে ঘুরাফেরা করা কেবলই অমুসলিমদের কালচার। এ সবই মুসলিমদের জন্য সম্পূর্ণ হারাম। (সূরা আলি ইমরান:১৪৯, সূরা লুকমান: ৬,৭)।

অতএব খাঁটি মুসলমান হিসেবে সকল প্রকার অনৈসলামী কার্যকলাপ থেকে বিরত থেকে রাসূলের (সা.) দেখানো পথ অনুযায়ী ঈদ উৎসব পালন করা আমাদের সকলের কর্তব্য। মহান আল্লাহ আমাদেরকে ঈদুল আযহার যথাযথ গুরুত্ব অনুধাবন করে পরিপূর্ণ ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের সাথে কুরবানী করে মহান রবের নৈকট্য হাসিলের তাওফীক নসীব করুন। আমীন।

লেখক: আরবি প্রভাষক, রামপুর আদর্শ আলিম মাদরাসা,
চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর।

একই রকম খবর