এ রঙ্গ সাঙ্গ কবে!

 রহিম বাদশা

আবহমান বাংলার চিরায়ত গ্রামীণ পটভ‚মিতে শৈশব অতিবাহিত হয়েছে আমার। ঋতুরাজ বসন্তে একদিকে যেমন ফেটে চৌচির হওয়া ফসলী জমির হাহাকার ছিল উল্টোদিকে গাছে-গাছে বিচিত্র পাখ-পাখালির হৃদয় মোহিনী কলতান, কোকিলের কুহুতান, অলস তরুণের পাগলকরা বাঁশির সুর, পত্র-পল্লবে প্রস্ফুটিত নবপুষ্প প্রাণ জুড়াতো।

প্রচন্ড তাপদাহের মধ্যেও পানিতে ডুবাডুবি, লবণ-মরিচ-দা/চাকু নিয়ে গাছের মগডালে উঠে আম বানানী খাওয়া, ফসলী মাঠে টমোটোর ভর্তা সাবার, গাছে গাছে সুশোভিত কচিপাতার বিপুল সমারোহ, ধান-পাটের জমিতে কৃষকের কর্মস্পৃহা জাগানো সঞ্জিবনী গান- প্রভৃতি ভুলিয়ে দিত গ্রীষ্মের প্রখরতা।

অবিরাম বৃষ্টিতে ভেজা, খালের নতুন স্বচ্ছ পানিতে জলকেলি, ভরা পুকুরে নাইতে নামা, ভোরে বিল থেকে শাপলা-শালুক তোলা, চাঁই-জাল-ফাঁদ পেতে মাছ ধরা, পানি থেকে কোনো মতে রক্ষা পাওয়া একচিলতে মাঠে ডিয়ার বল (ফুটবল) নিয়ে ছুটোছুটি- এমন নির্মল আনন্দ-বিনোদনে কাটতো ঋতুরাণী বর্ষা।

এই দু’ঋতুর সাথে বেশ মিতালী ছিল শুভ্রতায় পরিপূর্ণ শরতের। নতুন ফেলা বালি/মাটির ভিটিতে প্রস্ফুটিত কাঁশফুলের শুভ্রতা, খাল-বিলের স্বল্প জলে বর্ষার সর্বশেষ মাছ ধরা, সবুজ শ্যাওলা ডিঙ্গিয়ে খাল-বিলে নাইতে নামা, অলস বিকেলে রাস্তার পাশে কিংবা স্কুল মাঠে বড়দের হাডুডু খেলা প্রত্যক্ষ করার ক্যানভাস আজও স্মৃতিপটে অমলিন।

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগের সেই সময়টাতেও হেমন্ত ছিল দারুণ আবেদনময়ী। বাড়ি-বাড়ি মানুষের চরম ব্যস্ততা ছিল আমন ধান বানার কাজে। শিশু-কিশোর, ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পরিবারের সবাই ধান বানার কাজে লেগে যেত অতি উৎসাহে। কারণ, এই ধানের চালে প্রতিদিনের আহারের ব্যবস্থা হবে। তৈরী হবে পিঠা-পায়েস-সিন্নি কত কী! নবান্নের এই উৎসব ধনী-দরিদ্র সবার ঘরেই কম-বেশি হতো, যদিও এ উৎসবের নাম জানা ছিল না অনেকের।

প্রকৃতির নানা দুর্যোগের মধ্যে গ্রামের মানুষের কাছে সবচেয়ে সহনীয় ঋতু শীত। প্রায় বিদ্যুৎহীন সেকালের গ্রামীণ জীবনে শীত নিবারণ ছিল অপেক্ষাকৃত সহজসাধ্য। কিছু খরকুটো, ভারি কাঁথা, গায়ের পোশাকের উপর একখানা চাদর কিংবা জ্যাকেট, মাথায় একখানা মাপলার, জানালা-দরজা-বেলকনী মুড়িয়ে দিতে পারলেই শীতের আর ভয় কী! লেপ-কম্বল তো সামর্থবান ছাড়া অন্যরা কল্পনাও করতো না। ঝড়-তুফান, বৃষ্টি-বাদল আর তাপদাহের ঝুঁকি না থাকায় গ্রামীণ উৎসব ছিল শীতনির্ভর। ওয়াজ মাহফিল, ওরশ, মেলা, নাটক, যাত্রা, গানের আসর, খেলার আসরের মূল মৌসুম ছিল শীতকাল। একই হেতুতে বিয়ের মৌসুমও ছিল শীতকাল। ধান আর নানা ফসল বিক্রির টাকায় পুরো বছরের মধ্যে এই সময়টাতে গ্রামীণ অর্থনীতি থাকতো বেশ চাঙ্গা।
গাছ থেকে খেঁজুরের রস সংগ্রহ, খেঁজুরের রসের সিন্নি, খেঁজুরের লোভনীয় গুঁড়ের সাথে নানা ধরনের পিঠা, মুড়ি দিয়ে খাওয়ার সে কি আনন্দ! বটগাছের পাতার সাহায্যে তৈরী সেকালের বিখ্যাত ‘পাতার পীঠা’ আজকের প্রজন্মের দেখার সুযোগও হয় না, স্বাদ আস্বাদন তো দূরের কথা। প্রযুক্তির সুবিধাবিহীন ছেলেবেলার সেইসব শীতে সবচেয়ে আকর্ষণ আর বিনোদনের শ্রেষ্ঠ উপলক্ষ ছিল গ্রামীণ নাটক। মঞ্চনাটক আর যাত্রাপালার মিশেল ছিল বিলুপ্তপ্রায় এই গ্রামীণ নাট্যোৎসবে। গ্রামের উদ্দমী উৎসাহী একদল যুবক ও মধ্যবয়সী এই গ্রামীণ নাটকের সাথে জড়িত থাকতেন। তারা একাধারে অভিনেতা, সংগঠক, পরিচালক, প্রযোজন প্রায় সব দায়িত্ব নিজেরাই পালন করতেন। নাটকের জন্য চাঁদা উত্তোলন থেকে শুরু করে একাধিক চরিত্রেও কেউ কেউ অভিনয় করতেন। বাইরে থেকে আনা হতো পেশাদার নারী অভিনেত্রী, পোশাক, বাদ্যযন্ত্র, মাইক, হ্যাজাক লাইট (বিলুপ্তপ্রায়), মেকআপম্যান, ব্যান্ড পার্টি, মাইকম্যান আর নাপিত। এক থেকে দু’-তিন দিনব্যাপী নাটোৎসব হতো। একই ব্যক্তি টানা তিন দিন তিন নাটকেও অভিনয় করতেন। নাটক মঞ্চায়নের প্রায় এক মাস আগে থেকে শুরু হতো মহড়া।

তখন প্রায় সব গ্রামেই শীতের মৌসুমে এক/একাধিকবার নাটক প্রদর্শিত হতো। এর মধ্যে আমাদের এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠের নাটক ছিল আশপাশের বিশাল এলাকার মধ্যে বেশ আলোচিত নাট্যোৎসব। তেমনি এক শীতের রাতে প্রেমনির্ভর একটি নাটকের মঞ্চায়ন চলছিল। আমি তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষুদে ছাত্র। নাটক চলার এক পর্যায়ে নায়ককে (গরীবের সন্তান) দীর্ঘ সময় ধরে মারধর করছিল নায়িকার পিতার (রাজা) সিপাহিরা। কালো রঙের লম্বা একটি চাবুক দিয়ে তার শরীরে বার বার আঘাত করছিল ডোরা-কালো পোশাক পরিহিত বিদঘুটে চেহারার (মেপআপের কল্যাণে) কিছু অমানুষ।

একেকটি চাবুক নায়কের শরীরে লাগার সাথে সাথে বিকট শব্দ হচ্ছিল। আর গগণবিদারী চিৎকার দিয়ে নায়ক কাঁদছিল। মারের চোটে মাটিতে গরাগরি খাচ্ছিল বারবার। কতই না অনুনয়-বিনয় করে হামলা থেকে রক্ষা পেতে দয়া ভিক্ষা করছিল আর বিরহের গান করছি সে। বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর নায়কের উপর চলমান উপর্যুপরি অত্যাচার ও নির্যাতন দেখে আমি কেঁদে ফেললাম। তাদের এই নিষ্ঠুর আচরণে আমার দু’চোখ বেয়ে অঝোরে পানি ঝরছিল। কিন্তু আশপাশে চেয়ে দেখি কেউ আমার মতো কাঁদছে না। মনে হচ্ছিল এরাও কত নিষ্ঠুর!

আমার শিশুমনে তখন বারবার প্রশ্ন জেগেছিল- নাটকের জন্য একটা মানুষকে এভাবে মেরেই চলছে আর লোকটা কত অনুনয় করে কাঁদছে; কেউ তাতে সাড়া দিচ্ছে না কেন! আরো অবাক লাগছিল এই ভেবে যে- নায়বের চরিত্রে অভিনয় করা দুলাল গাজী নামের এই লোকটাকে রক্ষা করতে কেউ এগিয়ে আসছে না কেন? নাটক দেখতে আসা তার পরিবারের লোকগুলো এমন অত্যাচার আর নির্যাতন চোখের সামনে সহ্য করছে! তাদেরসহ উপস্থিত সকল দর্শক এবং নাটকের বাদবাকী কলাকুশলীদের প্রতি এক সময় আমার চরম ঘৃণা ও ক্ষোভের সঞ্চার হলো। এতগুলো মানুষের উপস্থিতিতে এমন নিষ্ঠুরতা আমাকে চরমভাবে ব্যাথিত করেছিল। শেষ পর্যন্ত কায়মনোবাক্যে মনে মনে ভাবছিলাম- আহ নাটকরা যদি এখনি শেষ হয়ে যেত! তাহলে বেচারা দুলাল গাজী এমন কঠিন অত্যাচার থেকে বেঁচে যেতেন। দেরীতে হলেও এক সময় আমার ইচ্ছে পূরণ হলো। নাটক সাঙ্গ হলো। যেই দুলাল গাজী এতক্ষণ নির্যাতনের কারণে মঞ্চে দাঁড়াতেই পারছিলেন না। উঠতে যেয়ে বার বার পড়ে গেছেন হাত-পায়ের চরম যন্ত্রণায়, নাটক শেষে এখন দেখি তিনি দিব্যি হেটে চলে যাচ্ছেন গ্রিন রুমে। এই দৃশ্য দেখে হাফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম। তখন কি জানতাম! ওই চাবুক আসল চাবুক ছিল না, আঘাতটাও সত্যি ছিল না, আওয়াজটা ছিল পাশের মিনি ঢোলে আঘাতের প্রতিধ্বনি। আর নায়কের চরিত্রে অভিনয় করা দুলাল গাজীর আঘাত পাওয়া, কান্নায় ভেঙ্গে পড়া কিংবা বারবার মঞ্চের মেঝেতে লুটিয়ে পড়া সব’ই ছিল নিছক অভিনয়! সে যাই হোক, সেদিনের সেই নাটকের সমাপ্তি আমাকে দারুণভাবে স্বস্তি দিয়েছিল।

কিন্তু সেই নাটক দেখার প্রায় তিন দশক পর রোহিঙ্গাদের উপর সে দেশের সেনাবাহিনীর সিপাহীদের অমানবিক ও ইতিহাসের বর্বরতম নির্যাতন আজ আমাকে-আমাদেরকে ব্যথিত করে, কান্নার জল চোখ ভাসায়। বিংশ শতাব্দীতে নাটকে প্রদর্শিত একজন দুলাল গাজীর উপর চালানো নির্যাতন পুরোপুরি অবাস্তব ও অভিনয় ছিল।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে লাখ লাখ রোহিঙ্গার উপর চালানো নির্যাতন পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম ঘটনা ও ইতিহাসের কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। অথচ আমাদের শৈশবের মতোই আনন্দময় শৈশব পাওয়ার কথা ছিল রোহিঙ্গা শিশু-কিশোরদের। সেখানে আজ তারা দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রিত কঠিন জীবনযাপন করছে। রোহিঙ্গাদের উপর চালানো নিষ্ঠুর অত্যাচার, নির্যাতন আর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ পৃথিবীর এক নারকীয় হামলার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

শৈশবে দেখা গ্রামীণ নাটকটি ছিল কল্পকাহিনীর ভিত্তিতে আর এখন রোহিঙ্গাদের উপর চালানোর ইতিহাসের নির্মম ও জঘন্যতম জাতিগত নিধনকে নিয়ে চলছে অদৃশ্য সব নাটক। মানবতার এই যুগেও এমন চরম অমানবিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে যখন জাতিসংঘের সর্বোচ্চ ফোরাম নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব উঠে তখন কোনো কোনো স্থায়ী সদস্যরাষ্ট্রের আপত্তি আমাদের বিষ্মিত করে, হতবাক করে। ভেটো প্রদানকারী এসব রাষ্ট্রের একটি আবার আমাদের দেশের জন্মকাল থেকে ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত। আরেকটি হালসময়ের আরেক ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাষ্ট্র ও উন্নয়ন অংশীদার। এই হলো বন্ধুত্বের নমুনা!

আবার মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এমন এমন রাষ্ট্র ও সংঘ আমাদের বন্ধুর ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হয়েছে যে তাতেও আমরা বিষ্মিত না হয়ে পারি না। এর মধ্যে এক পরাশক্তির রাষ্ট্র মিয়ানমারের বিপক্ষে ও আশ্রয়দাতা হিসেবে আমাদের পক্ষে দৃশ্যত যেভাবে অতি সরব হয়েছে তাতে আমাদের স্বস্তিতে থাকার কথা থাকলেও থাকা উচিৎ নয়। কারণ, এই পরাশক্তি বিগত শত-সহ¯্র বছরের ইতিহাসে কখনোই নিজেদের স্বার্থের বাইরে কারো জন্য কোনো সময় ব্যয় করেনি। কথিত আছে, এই পরাশক্তি যে দেশের মিত্র হয় সে দেশের নাকি আর কোনো শত্রæর প্রয়োজন পড়ে না। তুরস্ক, মালয়েশিয়াসহ কিছু মুসলিম দেশ নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পাশে থাকলেও সৌদি আরব ও ইরানের মতো প্রভাবশালী মুসলিম দেশগুলোর নীরবতা আমাদের আশাহত করে। প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র ভারতও নিজেদের স্বার্থ-সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে এ বিষয়ে প্রায় নির্বিকার। রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্য ও উপকরণ প্রদানে সীমাবদ্ধ তাদের সহযোগিতা। ভৌগলিক কারণে নাকি মিয়ানমারের সাথে সুসম্পর্ক রাখা বিদেশীদের কাছে খুব জরুরী। তাহলে মিয়ানমারের সীমান্তঘেঁষা বাংলাদেশ কি ভৌগলিক দিক থেকে গুরুত্বহীন? অথচ এতদিন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা বলে আসছিলেন, ভৌগলিক দিক থেকে এ অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার তথা বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা জাতিকে নির্যাতন ও তাদের মাতৃভ‚মি থেকে বিতারিত করার পরবর্তীতে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো যে আচরণ শুরু করেছে তাতে মনে হয় বৈশ্বিক এক নাটকের শিকার রোহিঙ্গারা। বিশ্ববিবেক আজ রয়েশয়ে ধীরলয়ে যেভাবে রোহিঙ্গা ইস্যুর পরিসমাপ্তি তথা মাতৃভ‚মি বিতারিত লাখ লাখ মানুষের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পথে হাটছেন তাতে এই নাটকের পরবর্তী দৃশ্যগুলো আমাদের অজানা। সঙ্গত কারণে সচেতন মহলে এখন যৌক্তিক জিজ্ঞাসা- এ রঙ্গ (নাটক) সাঙ্গ (সমাপ্তি) কবে?

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রোহিঙ্গা সমস্যাকে পুঁজি করে বিশ্বের সামরিক ও অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলো এ অঞ্চলে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা বা সামরিক/অর্থনৈতিক মজবুত ঘাঁটি প্রতিষ্ঠায় বেশ আগ্রহী। মানবিকতা, বন্ধুত্বতা প্রতিষ্ঠার আড়ালে এ অঞ্চলে যুদ্ধ অথবা রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের চিরস্থায়ী বিরোধ সৃষ্টির দূরভিসন্ধি থাকাও অমূলক নয়। কারণ, মানবতা, স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা কিংবা সন্ত্রাসবাদ, মারণাস্ত্র নির্মুলের নামে এই ধরার বহু দেশ ধ্বংস হয়েছে তাদের হিং¯্র থাবায়। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে- যুগের পর যুগ ধরে এসব পরাশক্তির শক্তিপরীক্ষায় বার বার চরম মূল্য দিতে হয়েছে দুর্বল দেশ বিশেষত মুসলিম দেশগুলোকে। আজ মিয়ানমার তাদের দেশের রোহিঙ্গা মুসলিম নাগরিকদের উপর যে বর্বরতা দেখিয়েছে পৃথিবীর কোনো মুসলিম দেশ কোনো অমুসলিম জাতির উপর এমন নিষ্ঠুরতা দেখালে শুধুমাত্র হুমকি-ধমকিতে কি দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখতো বিশ্বের শীর্ষ সামরিক জোট ও জাতিসংঘ? এতদিনে গোটা বিশ্ব থেকে একঘরে হয়ে যেত না সেই দেশ? তবে এখন কেন হচ্ছে না? মিয়ানমার মুসলিম দেশ নয় বলে? আক্রমণটা মুসলিমদের উপর বলে?

তবে এই জটিল কঠিন সমস্যা বাংলাদেশ সরকার যেভাবে দূরদর্শিতা, বুদ্ধিমত্তা ও ধৈর্য্যরে সাথে মোকাবেলা করছে তা গোটা বিশ্বের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। একটি উন্নয়নশীল দেশ এতটা বোঝা বইতে পারবে- সেটা কি কেউ কখনো ভেবেছিল? হয়তো বিতারণকারী দেশ ও তাদের পেছনের ইন্ধনদাতারা তা কল্পনায় আনতেও পারেননি। কিন্তু সদাসংগ্রামী বাংলাদেশ পেরেছে। সরকার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলা করে সম্ভাব্য বিপর্যয় ও যুদ্ধপরিস্থিতি থেকে রক্ষা করেছে দেশ ও জাতিকে। সহনশীলতা আর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিনাশ করেছে সব উস্কানি। কেবল উন্নয়নেই নয়, মানবিকতা প্রদর্শনেও সারা বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বাংলাদেশ রোল মডেল হয়েছে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে। মানবিকতা দেখাতে কেবল প্রাচুর্য’ই বড় উপাদান নয়, হৃদয়টা বড় থাকলেও চলে। বাংলাদেশ তা দেখিয়ে দিয়েছে। এ জন্য বাংলাদেশ, দেশের সরকার, সরকার প্রধান সর্বোপরী দেশের জনগণ নোবেল পুরস্কারটা পাওনাই থেকে গেল। এত উদারতা আর কত রাষ্ট্রনায়ক, কত দেশ, কত জাতি দেখাতে পেরেছে? তবে আরেকটি দেশের সৃষ্ট এই সংকট দীর্ঘ সময় ধরে বয়ে চলা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়, সম্ভব করাটাও ভালো নজির হবে না। তাই বিতারিত রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে বিশ্ববিবেকের সত্যিকারের বন্ধুত্ব প্রয়োজন আমাদের।

লেখক : রহিম বাদশা,

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক,

দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহ।

একই রকম খবর

Leave a Comment