কচুয়ায় প্রয়াত ইউপি চেয়ারম্যান ইদ্রিস মিয়া যুগযুগ ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন

যুগে যুগে বহু মনিষী ও কৃতি মানুষের জন্য হয়েছে। স্ব স্ব ক্ষেত্রে তারা কৃতিত্বের জন্য নানান ভাবে কাজ করে গেছেন রেখে গেছেন নানান স্মৃতি। ফলে ওইসব গুণী মানুষজন আমাদের না থাকলে তাদের কর্মের কারনে স্মৃতি হয়ে আছেন।

তেমনি একজন আলোকিত মানুষ মৌলভী ইদ্রিস মিয়া কচুয়া উপজেলার পশ্চিম জনপদের ৫নং পশ্চিম সহদেবপুর ইউনিয়নের নন্দনপুর গ্রামে পল্লী নিভৃতে জম্মগ্রহন করেন। বণার্ঢ্য জীবনে তিনি একজন সফল মানুষ ছিলেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি একজন শিক্ষক,ন্যায় বিচারক,সমাজসেবক ও পরোপকারী মানুষ হিসেবে এলাকাবাসীর কাছে পরিচিত ছিলেন।

টানা ৩৬ বছর কচুয়া উপজেলার ৫নং পশ্চিম সদেবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। পাকিস্তান সরকার থেকে দেশ স্বাধীনের পর টানা ৩৬ বছর চেয়ারম্যান থাকায় এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। প্রতিষ্ঠাতা করেন নন্দনপুর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়,নন্দনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বেশকিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যার প্রতিষ্ঠিত নন্দনপুর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয় এখন হাজারো শিক্ষার্থীদের বাতিঘর হিসেবে এলাকায় আলোকিত করছেন।

তিনি আরো কিছু দিন বেচেঁ থাকলে ওই এলাকায় আরো বেশি আলোকিত হতেন বলে স্থানীয় লোকজন জানান। নির্লোভ ও নিরহংকারী মানুষ মৌলভী ইদ্রিস মিয়া কারো ক্ষতি করেছেন এমন নজির নেই ওই ইউনিয়নে নেই বলে সাধারন মানুষ জানান।

তিনি দীর্ঘদিন চেয়ারম্যান থাকাকালীন নানান ভাবে এলাকায় মানুষের সহযোগিতা ও সেবা করেছেন বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। গুনী ও সফল এই মানুষটি ২০০১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে পরপারে চলে যান। তাই আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে মরহুমের প্রতিষ্ঠিত নন্দনপুর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয় ও পরিবারের আয়োজনে স্মরনসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।

পেছনের কথা: মরহুম মৌলভী ইদ্রিস মিয়া ১৯২৭ সালে নন্দনপুর গ্রামের এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তার প্রয়াত পিতা হাজী কালা মিয়া ও মাতা আতরজান বিবি।

মৌলভী ইদ্রিস মিয়া ২০০১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। জীবদ্দশায় তিনি ৪ ও ৫নং বৃহত্তর পশ্চিম সহদেবপুর ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং তিনি ওই ইউনিয়নকে দুটি ভাগে ভাগ করেন।

মৌলভী ইদ্রিস মিয়াকে নিয়ে অপপ্রচার :

নন্দনপুর গ্রামের প্রয়াত জনপ্রিয় ইউপি চেয়ারম্যান মৌলভী ইদ্রিস মিয়াকে নিয়ে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ফেসবুক) এবং ১৬ ডিসেম্বর স্থানীয় কিছু পত্রিকায় তাঁকে মনগড়া ভাবে স্বাধীনতার বিপক্ষের লোক দাবি করে নানান ভাবে অপপ্রচার চালায় একটি মহল। ওই অসত্য সংবাদের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন এলাকাবাসী,বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও মরহুম ইদ্রিস চেয়ারম্যানের পরিবার।

বাবার স্মৃতি রক্ষায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ পুত্র ডা: ইসমাইল হোসেন সিরাজী:

ডা: ইসমাইল হোসেন সিরাজী প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শেষ করের ১৯৭২ সালে নন্দনপুর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ে থেকে এসএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৭৪ সালে মতলব ডিগ্রি কলেজ থেকে সাফল্যের সাথে এইচএসসি পাস করেন। তিনি ১৯৭২ সালে কচুয়া উপজেলার ৫নং পশ্চিম সহদেবপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন।

মতলব ডিগ্রি কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭৬ সালে সিলেট মেডিকেল কলেজে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তৎকালীন সময়ের ছাত্রলীগ নেতা এহতেশাম হক চৌধুরী দুলাল বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) মহাসচিব পদে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৮২ সালে কর্মজীবনে প্রবেশের পর থেকে তিনি স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (সচিপ) সদস্য হয়ে বর্তমানে আজীবন সদস্য পদে রয়েছেন ।

মতলব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে (আরএমও) থাকাকালীন ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালে বিভিন্ন সময়ে বিএনপি-জামাত সরকারের আমলে বহু হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়ে খাগড়াছড়ি,রাজশাহীসহ বহু স্থানে বদলী হয়েছেন। ২০০১ সালে পালাখাল-সেঙ্গুয়া সড়কে রাস্তায় গাছ ফেলে ডা: ইসমাইল হোসেন সিরাজীকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। একই বছরে ৩ অক্টোবর টঙ্গীর বাসায় সাবেক এক প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রীর ইন্দনে তার বাসায় হামলা,ভাংচুর করা হয়। ওই সময় আওয়ামী দলীয় সাবেক এমপি আহসান উল্যাহ মাষ্টারের সার্বিক পরামর্শ ও সহযোগিতায় তিনি প্রাণে রক্ষা পান।

পরবর্তীতে তিনি ২৬৪ দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে বেড়ান। এক কথায় ১৯৯১ সালে মতলব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আরএমও এবং ২০০১ সালে টঙ্গীতে একটি হাসপাতালের দায়িত্ব পালন কালে তৎকালীন বিরোধী দলের হাতে তিনি নানান ভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

২০০৪ সালে বিভিন্ন অসুস্থ্যজনিত কারনে চাকরি থেকে সরে আসেন। ২০১০ সালে চাকরি পূর্নবহালের আবেদন করলে মানণীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক বিবেচনা করে তার চাকরি পূর্নবহাল করেন।

তখন তিনি কালীগঞ্জ ও গাজীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ তিনি ২০১৬ সালে ফেনী জেলার সিভিল সার্জন হয়ে চাকুরি থেকে অবসর গ্রহন করেন। বর্তমানে তিনি টঙ্গী,ব্রাহ্মনবাড়িয়াসহ নিজ এলাকায় ধর্মীয় ও সামাজিক কাজে সম্পৃক্ততা রেখে সুনামের সাথে জড়িত থেকে কাজ করে যাচ্ছেন।

মরহুম মৌলভী ইদ্রিস মিয়া ৫ ছেলে ও ৪ মেয়ে রয়েছে। তন্মধ্যে ডা: ইসমাইল হোসেন সিরাজী সাবেক সিভিল সার্জন,আবু ইউসুফ (সমাজসেবক),মো: ইব্রাহিম ঢাকা বারডেম হাসপাতালের পরিচালকের পিএ,আবু মুসা নন্দনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কচুয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারন সম্পাদক ও ছোট ছেলে মো: হোসেন একজন ব্যবসায়ী এবং ৪ মেয়ে ও তাদের পরিরার স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।

ডা: ইসমাইল হোসেন সিরাজী বলেন, আমার বাবা দীর্ঘদিন চেয়ারম্যান থেকে এলাকায় প্রতিহিংসার রাজনীতি করেননি তিনি উন্নয়নের রাজনীতি করেছেন। তৎকালীন সময়ে তিনি সিএসপি পুলিশ অফিসার না হয়ে এলাকার মানুষের মন জয় করে জনপ্রতিনিধি হয়ে এলাকাকে উন্নয়নের ছোয়া লাগিয়েছেন।

যারা আমার প্রয়াত বাবাকে নিয়ে অপপ্রচার চালান আমি আল্লাহর কাছে বিচার চাইব। তিনি বলেন, হাজীগঞ্জে যুদ্ধকালীন সময়ে অল্পের জন্য আমার বাবা পাকিস্তানির হাত থেকে রক্ষা পায়। অথচ আমার বাবাকে নিয়ে একটি মহল মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি কারো ক্ষতি করেননি। তিনি চাইলে অেেনক রাতারাতি হতেন। কিন্তু আমাদের ধন-সম্পদ বলতে কিছুই নেই।

মরহুম মৌলভী ইদ্রিস মিয়া সম্পর্কে যা বললেন বিশিষ্টজনরা :

আইয়ুব আলী পাটওয়ারী,সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও কচুয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি: বলেন, মরহুম মৌলভী ইদ্রিস মিয়া চেয়ারম্যান একজন সৎ ও সাহসী মানুষ ছিলেন। তিনি এলাকার মানুষকে ভালোবাসেন বিধায় দীঘ ৩৬ বছর চেয়ারম্যান ছিলেন।
আব্দুল ওয়াদুদ,চাঁদপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার,যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, আমার জানামতে তিনি ভালো মনের মানুষ ছিলেন। খারাপ হলে আমরা তো জানতাম।

আব্দুল মবিন, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার: তিনি জানান, ইউপি চেয়ারম্যান মৌলভী ইদ্রিস মিয়া একজন সাহসী মানুষ ছিলেন। তৎকালীন স্বাধীনতার সময়ে তিনি মুসলিমলীগ করলেও মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারকে নানান ভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র ও খাদ্য দিয়ে সহায়তা করে তিনি ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন।

ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস সামাদ আজাদ জানান, আমার ইউনিয়নের বাসিন্দা মরহুম মৌলভী ইদ্রিস মিয়া একজন সবর্জন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ছিলেন। দলমত নির্বিশেষে এলাকায় তাঁর ব্যাপক সুনাম ও গ্রহনযোগ্যতা ছিল। তিনি এলাকাকে আলোকিত করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ নানান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান করে গেছেন।

ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম লালু বলেন, মরহুম মৌলভী ইদ্রিস মিয়া চেয়ারম্যান একজন সাহসী ও প্রভাব শালী মানুষ ছিলেন। তিনি মুসলিম লীগ করলেও প্রয়াত এমপি মরহুম মিসবাহ উদ্দিন খানের সাথে বন্ধুত্ব ও ভালো সম্পর্ক ছিলো।

অ্যাড. শাহআলম ইকবাল বলেন, ইদ্রিস চেয়ারম্যান একজন জনপ্রিয় মানুষ ছিলেন। তার শাসন আমলে এলাকায় মানুষ শান্তিতে ছিল। যদি তিনি খারাপ মানুষ হতেন তাহলে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা তাকে হত্যা করত। কিন্তু তিনি স্বাধীনতার পরও দীর্ঘদিন চেয়ারম্যান ছিলেন।

কাজী সফিকুর রহমান বলেন, মরহুম মৌলভী ইদ্রিস মিয়া চেয়ারম্যান একজন সাদা মনের মানুষ ছিলেন। তিনি এলাকায় সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি হিসেবে এলাকার সুখে দু:খে সাধারন মানুষের পাশে থেকে টানা ৩৬ বছর ইউপি চেয়ারম্যান ছিলেন। তাঁর সময়ে তিনি ওই ইউনিয়নকে পশ্চিম সহদেবপুর ও পূর্ব সহদেবপুর নামে ভাগ করেন। এসব কারনে তাঁর শাসন আমলকে স্বর্নযুগ বলে এলাকার মানুষ দাবি করেন।

আওয়ামী লীগ নেতা মো: মোতাহের হোসেন পাটওয়ারী দুলাল জানান, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ছোট ছিলাম। দাদা ও বাবার সাথে তৎকালীন সময়ে কচুয়া বাজারে যেতাম। তখন থেকেই মরহুম মৌলভী ইদ্রিস চেয়ারম্যানের কথা শুনতাম।তিনি অত্যান্ত সাদা মনের মানুষ ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি আমার এলাকার একজন নারীকে স্বাধীনতার বিরোধীদের হাত থেকে তার ইজ্জত রক্ষা করেন। পাশাপাশি শতশত ভালো কাজের ইতিহাস হিসেবে স্বাক্ষী রেখে গেছেন।

সুভাষ চন্দ্র দাস,কচুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রাক্তন অফিস সহায়ক কোয়া গ্রামের সুভাস চন্দ্র দাস জানান, যুদ্ধাকালীন সময়ে ইদ্রিস চেয়ারম্যান আমার পরিবারের পাশে দাড়িঁয়েছেন। পাকিস্তানিদের ভয়ে আমরা যখন আতঙ্কিত ছিলাম। ওই সময়ে ইদ্রিস চেয়ারম্যান আমার মা বাবাসহ আমাদের দীর্ঘদিন তার বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন।

এদিকে এলাকাবাসী জানান, মরহুম মৌলভী ইদ্রিস মিয়া চেয়ারম্যান এলাকার উন্নয়নে আজীবন সাদা মনের মানুষ হিসেবে কাজ করে গেছেন। তাঁর ছেলে ও মেয়েরা বর্তমানে সমাজে বিভিন্ন ভাবে প্রতিষ্ঠিত। আমাদের এলাকায় এমন একজন গুনী মানুষ বড়ই অভাবের তাঁর মৃত্যুর শূন্যতা কখনো পুরন হওয়ার নয়।

 

লেখক পরিচিতি:
জিসান আহমেদ নান্নু
সাবেক সাধারন সম্পাদক,কচুয়া প্রেসক্লাব
ও কচুয়া উপজেলা প্রতিনিধি, দৈনিক যুগান্তর।
মোবা: ০১৮১৪-৮২৩৬১৬

একই রকম খবর