চাঁদপুরে ‘কৈশোরবান্ধব উপজেলা’ কার্যক্রম কমিউনিটি ক্লিনিকে চলমান রয়েছে

কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সময় তাদের জন্যে যে চিকিৎসা সেবা এবং শিক্ষা প্রয়োজন, তা বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে চাঁদপুর সদর উপজেলায় শুরু হয়েছিল ‘কৈশোরবান্ধব উপজেলা’ কার্যক্রম।

এই উদ্ভাবনী পরিকল্পনাটির উদ্ভাবক হচ্ছেন সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সাজেদা বেগম পলিন। আর এটিই চাঁদপুর জেলায় কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য সেবা ও শিক্ষা নিয়ে ব্যাপক পরিসরে শুরু হওয়া প্রথম কোনো উদ্ভাবনী কার্যক্রম।

এর অনেক পরে হাজীগঞ্জ উপজেলায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে নারী শিক্ষার্থীদের জন্যে দুটি কাজ চালু হলেও এর প্রভাব ‘কৈশোরবান্ধব উপজেলা’ কার্যক্রমের ন্যায় এতোটা ব্যাপক নয়। হাজীগঞ্জ উপজেলায় যেটি করা হয়েছে তা হচ্ছে- ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত হতদরিদ্র পরিবারের মেয়েদের সাইকেল দেয়া, যেটি চালিয়ে ওই মেয়ে শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসা-যাওয়া করবে। আরেকটি করা হয়েছে সকল মেয়ে শিক্ষার্থীকে স্যানিটারি প্যাড দেয়া।

তবে সাইকেল যেসব শিক্ষার্থীকে দেয়া হয়েছে সেগুলো তারা বিদ্যালয় থেকে বিদায় নেয়ার সময় জমা দিয়ে যাওয়ার শর্তারোপ করে দেয়া হয়। স্কুলে স্কুলে গিয়ে মেয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে স্যানিটারি প্যাড বিতরণ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের রুটিন ওয়ার্ক।

অপরদিকে রুটিন ওয়ার্কের বাইরে গিয়ে স্কুলগামী এবং স্কুলের বাইরে থাকা কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিয়ে ব্যাপক পরিসরে কাজ করার লক্ষ্যে ‘কৈশোরবান্ধব উপজেলা’ নামে উদ্ভাবনী পরিকল্পনা হাতে নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেন চাঁদপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সাজেদা বেগম পলিন। ২০১৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর এই পরিকল্পনাটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় সদর উপজেলার বাগাদী ইউনিয়ন দিয়ে। সেদিন ‘কৈশোরবান্ধব ইউনিয়ন’ নামে এই উদ্ভাবনী পরিকল্পনাটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এর উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ জেআর ওয়াদুদ টিপু।

জেলা প্রশাসক মোঃ মাজেদুর রহমান খানের প্রতিনিধি হয়ে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জামান। অতিথি ছিলেন সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম নাজিম দেওয়ান, চাঁদপুর পৌরসভার বর্তমান মেয়র অ্যাডঃ জিল্লুর রহমান জুয়েল, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কানিজ ফাতেমা, বিশিষ্ট চিকিৎসক স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ সৈয়দা বদরুন নাহার চৌধুরী, সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী বেপারী, চাঁদপুর প্রেসক্লাবের তৎকালীন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ আরো গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথিরা তাদের বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘এমন একটি উদ্ভাবনী পরিকল্পনা সারাদেশের জন্যে মডেল হতে পারে। সেদিন বাগাদী গণি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে ‘কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেবা কর্নার’ নামে একটি কক্ষকে নির্ধারণ করে কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং পুষ্টি সেবা কার্যক্রম চালু করা হয়। একই সাথে বাগাদী আহমাদিয়া ফাযিল মাদ্রাসায় এবং বাগাদী ইউনিয়ন কমিউনিটি ক্লিনিকে এই কার্যক্রম চালু হয়।

ধীরে ধীরে মাত্র তিন মাসের মধ্যে সদর উপজেলার মাধ্যমিক পর্যায়ের ২২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা ২২টি স্কুল ও মাদ্রাসায় ‘কৈশোরবান্ধব’ কার্যক্রম চালু হয়। আর কমিউনিটি ক্লিনিক উপজেলার সব কটি তথা ৪৪টিতেই এই কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু মার্চের শেষ দিক থেকে দেশে করোনা মহামারী শুরু হয়ে যাওয়ায় সারাদেশে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একযোগে বন্ধ হয়ে যায়। তখন থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও কমিউনিটি ক্লিনিকে একদিনের জন্যও বন্ধ হয় নি। এখনো উপজেলার সকল কমিউনিটি ক্লিনিকে কৈশোরবান্ধব কার্যক্রম চলছে।

এই ‘কৈশোরবান্ধব’ কার্যক্রমের উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে- কিশোর-কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালে যে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটে, তখন তারা সঠিক স্বাস্থ্য সেবা এবং শিক্ষা না পাওয়ায় নানা দুর্ঘটনা ঘটে থাকে, অনেকে বখে যায়। তাদের এই আবেগী মনের বয়সে তাদের মনোজগতে ভালো চিন্তা ভাবনার উদ্রেক ঘটাতে হয়। তাছাড়া এই বয়সে ছেলে মেয়েদের পুষ্টিকর খাবার এবং পরিস্কার থাকাটা যে কতটা জরুরি তা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিয়ে থাকেন সরকারি চিকিৎসকরা।

একই সাথে স্বাস্থ্য সেবার নানা উপকরণ ও বিতরণ করা হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অধীনে কর্মরত চিকিৎসকগণ রুটিন মাফিক সপ্তাহে তিনদিন প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে এ কাজটি করে থাকেন। তারা স্কুল ও মাদ্রাসার স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেবা কর্নারে গিয়ে আগে পরে মেয়ে ও ছেলে শিক্ষার্থীদের একত্রিত করে স্বাস্থ্য সেবা এবং মানসিক পরিবর্তন জনিত নানা চিন্তা ভাবনার উদ্রেকের ফলে নেতিবাচক কাজ থেকে বিরত থাকতে প্রয়োজনীয় শিক্ষা দিয়ে থাকেন। একই কাজ কমিউনিটি ক্লিনিকেও চলে।

এই কার্যক্রমের উদ্ভাবক ডাঃ সাজেদা বেগম পলিন জানান, ২০১৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর তার উদ্ভাবনী কার্যক্রমটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলেও তিনি আরো আগে থেকেই এই কাজ করে আসছেন। এমন উদ্ভাবনী চিন্তা তাঁর মাথায় কীভাবে আসল এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যে সময়টাতে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়ে থাকে সে সময়ে স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ক্লাসে থাকে। এ কারণে তারা সরকারি চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। তাই ‘চিকিৎসক এবং চিকিৎসা সেবা যাবে শিক্ষার্থীদের কাছে’ এই চিন্তা থেকেই আমার ‘কৈশোরবান্ধব’ কার্যক্রম নিয়ে পরিকল্পনার বিষয়টি মাথায় আসে।

সে থেকেই আমার এই প্রকল্পটি হাতে নেয়া। তিনি আরো জানান, যে সব ছেলে মেয়েরা স্কুল মাদ্রাসায় যায় না, তাদের জন্যে কমিউনিটি ক্লিনিকে নির্দিষ্ট কর্নার খুলে এই সেবা দেয়া হচ্ছে। তাঁর এই কার্যক্রমটি ইতিমধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের দৃষ্টিগোচরে এসেছে এবং মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি মাউশির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে এনেছেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে এই প্রকল্পের জন্যে অর্থ বরাদ্দও আসার প্রক্রিয়ায় আছে বলে তিনি এই প্রতিবেদককে জানান।

একই রকম খবর