চাঁদপুরে ১২০ টাকায় পুলিশে চাকরি পেলেন যাঁরা

চাঁদপুর খবর রিপোর্ট : চাঁদপুরের শাহরাস্তির চেড়িয়ারা গ্রামের এবাদুল হাসান মুন্না (২০)। গত দুই বছর আগে তার বাবা দিনমজুর রফিকুল ইসলাম নৃশংস হত্যকাণ্ডের শিকার হন। বাবাকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েন মুন্না। কিন্তু পরিবারে বড় সন্তান তিনি।

মা আর ছোট চার ভাইবোনকে তার বুঝতে দেননি। এরই মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে এলাকার একটি কলেজে স্নাতক প্রথমবর্ষে ভর্তি হন মুন্না। তার মধ্যে খবর পেলেন পুলিশ কনস্টেবল পদে লোক নেওয়া হবে। মায়ের দোয়া আর ছোট ভাইবোনদের মাথায় হাত রেখে ১২০ টাকা খরচ করে চাকরির জন্য আবেদন করেন। কয়েকদিন পর ডাক পড়ে। শারীরিক ফিটনেস, নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তারপর লিখিত পরীক্ষা এবং সবশেষ মৌখিক। ব্যস্ কোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা ছাড়াই চাকরি!

শুধু এমন একজন মুন্না-ই নয়, জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে পুলিশের কনস্টেবল পদে আবেদন করেছেন, দরিদ্র অসহায় এমন আরো অনেক পরিবারের তরুণ-তরুণী পুলিশে চাকরির সুযোগ পেলেন। এদের মধ্যে উল্লেখ করা যেতে পারে ফরিদগঞ্জ পৌরসভার কেরোয়া গ্রামের রাজমিস্ত্রি আহসান হাবীবের ছেলে নজরুল ইসলাম, চাঁদপুর সদরের মধ্য ইচুলি গ্রামের রিক্শাভ্যান চালক জামাল হোসেনের ছেলে জাকির হোসেন কিংবা মতলব উত্তরের সুমাইয়া আক্তার।

পুলিশ বাহিনীতে মাত্র ১২০ টাকায় চাকরি। যেখানে চাকরির বাজার এখন সোনার হরিণ। সেখানে জীবনের এমন প্রাপ্তিতে দারুণভাবে উচ্ছ্বসিত একদল এমন তরুণ-তরুণী। যাদের সবার বাড়ি চাঁদপুরের বিভিন্ন স্থানে। এদের কারোর বাবা নেই, আবার কারো বাবা দিনমজুর, রিক্শাভ্যান চালক কিংবা রাজমিস্ত্রি। কোনো ধরনের তদবির এবং অনৈতিক চাপ ছাড়াই পুলিশ কনস্টেবল পদে এমন চাকরি। আর সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে মঙ্গলবার রাতেই পুলিশ বাহিনীতে চাকরির এই সুযোগ নিশ্চিত হলো।

চাঁদপুরে পুলিশের কনস্টেবল পদে চাকরির জন্য ছয় হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়ে। অথচ তার বিপরিতে শুন্য পদ ছিল মাত্র ৬৭টি। ঘোড় দৌড়ের মতো এমন কঠিন প্রতিযোগিতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরে আনন্দে কেঁদে ছিলেন সবেমাত্র চাকরি পাওয়া এই তরুণী। মঙ্গলবার রাতে চাঁদপুর জেলা পুলিশ লাইন্স এ এই তরুণীর মতো আরো অনেকেই মাত্র ১২০ টাকা খরচ করে সরকারি এমন চাকরি পেয়ে দারুণভাবে উচ্ছ্বসিত।

এর আগে গত তিন সপ্তাহ ধরে শারীরিক যোগ্যতা, লিখিত পরীক্ষা আর কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে নানা ধরনের প্রক্রিয়া শেষ করতে হয় তাদের। সবশেষ অনুষ্ঠিত হয় মৌখিক পরীক্ষা। আর তাতেই বাজিমাত। ফলাফল ঘোষণা শেষে ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয় তাদের। যাদের কারোর বাবা নেই, আবার কারো বাবা দিনমজুর, রিক্শাভ্যান চালক কিংবা রাজমিস্ত্রি। চাকরির নামে সোনার হরিণের এই বাজারে ঘুষ, তদবির আর কোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা ছাড়াই পুলিশের চাকরি পেয়ে বেশ খুশি- অতিসাধারণ পরিবার থেকে আসা এসব তরুণ-তরুণী। এসময় আনন্দে অনেকেই কেঁদে ফেলেন। বাদ পড়েনি তাদের সঙ্গে আসা অভিভাবকরাও।

এদিকে, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিতার নিশ্চিত পরিবেশ তৈরি করেছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক। যে কারণে পুলিশ বাহিনীতে এমন চাকরির সুযোগ। এমন তথ্য জানালেন জেলা পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ। তিনি আরো জানান, সব মিলিয়ে ছয়হাজারের বেশি তরুণ-তরুণী পুলিশ কনস্টেবল পদের জন্য আবেদন করেন। এদের মধ্যে যাচাই বাছাই শেষে ২ হাজার ১৯৭ জন লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন। সবশেষ যারা সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়েছেন। তাদের মধ্যে মৌখিক পরীক্ষায় সবচেয়ে ভালো করেছেন। সেই ৬৭ জনকে চূড়ান্তভাবে চাকরির প্রাথমিক ধাপ নিশ্চিত করা হয়েছে। যারা মাত্র ১২০ টাকা ব্যয় করেছেন এই চাকরির জন্য।

অন্যদিকে, পুলিশ কনস্টেবল পদে সদ্য চাকরি পাওয়া এসব তরুণ-তরুণীকে ফুল দিয়ে সম্মাননা প্রদান করা হয়। এতে অন্যদের মধ্যে বিশেষ অতিথি ছিলেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) সুদীপ্ত রায়, মনোয়ন বোর্ডের অন্যতম সদস্য কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফজাল হোসেন উজ্জল, লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিনতানুর রহমান, প্রেস ক্লাব সভাপতি গিয়াসউদ্দিন মিলন, সাবেক সভাপতি ইকবাল হোসেন পাটোয়ারী, সাধারণ সম্পাদক রিয়াদ ফেরদৌস প্রমুখ।

পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি পাওয়া এসব তরুণ-তরুণীর আরো কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী কয়েকদিন পর ছয় মাসের জন্য প্রশিক্ষণে অংশ নেবে। তারপর মূল পেশায় যোগদান করবেন তারা।

প্রসঙ্গত, এর আগে বিগত ২০১৮ সালে মাত্র এক শ দুই টাকায় পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি পাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে-তৎকালীন পুলিশ সুপার জিহাদুল কবিরের সময়। সেই ধারায় এবারো এমন স্বচ্ছতার নজির স্থাপন করলেন পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ।

একই রকম খবর