জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাস হলো মাহে রমজান : পর্ব-১

বছর ঘুরে আমাদের সামনে আবারো মাহে রমযান উপস্থিত। এ মাসটি দু’টি কারণে গৌরবময় হয়ে রয়েছে। একটি হলো মুসলিম জাতির চির ঐতিহ্য সিয়াম সাধনার মহাব্রত নিয়ে উপস্থিত হয় মুসলমানদের দ্বারে। এ মর্মে মহান রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেন “হে বিশ্বাসীগণ শোন! তোমাদের ওপর সিয়ামকে অবধারিত (ফরয) করা হয়েছে যেমনটি করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর (এ জন্য যে) সম্ভবত তোমরা তাকওয়া অর্থাৎ আল্লাহভীতি অর্জন করতে পারবে (সূরা আল বাকারা, আয়াত নং-১৮৩)।
উল্লিখিত আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সিয়াম বা রোজাকে মানব সৃষ্টির পর থেকেই তাদের ওপর করণীয় হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।

দিন ও কালের ভিন্নতা একেক সময় একেক রকম অবশ্যই ছিল। যেমন রমযান মাসের রোজা ফরয হবার আগে মহরমের রোজা কোনো কোনো নবীর উম্মতগণ পালন করতেন। বর্ণিত আছে যে, হযরত আদম (আ.) প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে সিয়াম পালন করতেন। যাকে বর্তমানে আইয়্যামে বিজের রোজা বলা হয়ে থাকে। মাহে রমযানের সিয়াম বা রোজা ফরয হবার পর ঐ সমস্ত রোজা নফল হিসেবে গণ্য হয়েছে।

সিয়াম বা রোজাব্রতের পালনীয় বিষয় হলো দীর্ঘ একমাস প্রতিদিন সুবহে সাদেক থেকে সূর্যান্ত পর্যন্ত পানাহার, যৌন সম্ভোগ নিষিদ্ধ ও রাত্রে আরাম আয়েশ উপভোগকে সীমিত রাখা। মূলত এ সমস্ত বিষয় মানুষের জন্য অবৈধ কিছু নয়। কিন্তু এগুলো যখন সমাজে মাত্রারিক্তভাবে চালু হয় এবং বৈধতার সীমা ছড়িয়ে যায় তখনই কেবল সমাজে নানারূপ বিশৃঙ্খলা, হানাহানি, খুনাখুনিসহ সব রকম অশান্তি সৃষ্টি হয়।

সৃষ্টির আদি থেকে মানব সমাজে যে তিনটি বিষয়, বিপর্যয় সংঘটনের জন্য দায়ী তাহলো উদরপূর্তি বা ভোগ বিলাস, নারী সম্ভোগ ও অতি আরাম লাভের আশায় উচ্চাভিলাষী মনোবৃত্তি পোষণ। লাগামহীনভাবে যদি এগুলো চরিতার্থ করার মানসিকতা গড়ে ওঠে তাহলে অন্যের অধিকারকে খর্ব করার প্রশ্ন চলে আসে আর এ ক্ষেত্রে মানুষ ন্যায়নিষ্ঠা, কর্তব্যপরায়ণতা ও দায়িত্ববোধের গণ্ডি থেকে বেড়িয়ে এসে এহেন অপকর্ম নেই যা করতে সে দ্বিধাগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে সমাজে মারামারি, হানাহানি, যুদ্ধবিগ্রহ, হত্যা, সন্ত্রাস, অশ্লীলতা ও সব রকম অন্যায় তথা অপকর্মের । শান্তিময় মাটির পৃথিবী অসহনীয় অগ্নিগর্ভে রূপান্তরিত হয়।

সহজ কথায় বলা যায়, মানবতা বিবর্জিত এমন একটি অসভ্য সমাজ কাঠামো তৈরি হয় যা পশু সমাজের চেয়েও জঘন্যতম। পবিত্র কুরআনুল কারীমের ভাষায় যাকে এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে ইনহুম ইল্লা কালআনআম বালহুম আদাল্লু সাবিলা।

অর্থাৎ নিশ্চয়ই ওরা হলো জন্তু জানোয়ার বরং তার চেয়েও গোমরাহ বা ভ্রান্তপথ অনুসারী। এ সমস্ত মানবতা বিধ্বংসী পঙ্কিলতার করালগ্রাস থেকে রক্ষা পেতে হলে প্রয়োজন আল্লাহভীতি তথা আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার হুকুমের নিঃশর্ত তাবেদারী।

রমযানের সিয়াম সাধনা মানুষকে মহান রাব্বুল আলামীনের দেয়া আইনের মধ্য থেকে জীবনের যাবতীয় কার্যাদি সম্পন্নের শিক্ষা দান করে থাকে। মাহে রমযানে যে রাব্বুল আলামীনের নির্দেশে দিবাভাগে যাবতীয় হালাল পানাহার যৌনবৃত্তি তথা কামনা বাসনা চরিতার্থ থেকে বিরত এবং রাত্রিতে দেহমনের তৃপ্তি মেটানোর মত নিন্দ্রা থেকে দূরে থাকতে হয় সেই আল্লাহ সুবহানাহু তায়লার নির্দেশেই যাবতীয় অন্যায়, জুলুম, অত্যাচার, আল্লাহদ্রোহী কার্যক্রম ও অন্যের অধিকার হরণ থেকে বিরত থাকাটাই হলো সিয়াম সাধনার মূল প্রশিক্ষণ।

এছাড়া নিছক পানাহার থেকে বিরত থেকে কষ্ট করার মধ্যে খুব বেশি সফলতা নেই। এ মর্মে মহানবী (সা.)’র একটি হাদিস এভাবে বর্ণিত হয়েছে- মানলাম ইয়াদিউ কাওলাজযুর ওয়াল আমালবিহী লাইসালিল্লাহি হাজাতুন ফি আই ইয়াদয়া তা’য়ামাহু ওয়া শারাবাহু অর্থাৎ (রোজা রেখে) কেউ যদি মিথ্যা কথা বলা ও তদনুযায়ী কাজ করা পরিত্যাগ না করে তবে তার শুধু খাদ্য ও পানীয় পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।

মানুষের লাগামহীন অন্যায় কামনা বাসনা দমন করে নিজের যাবতীয় ইচ্ছা ও কার্যক্রমকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পন্ন করাই হলো সিয়ামসহ সকল ইবাদতের আসল লক্ষ্য।

এছাড়া নিজের খেয়ালখুশী ও প্রচলিত চিন্তা-চেতনা অনুযায়ী পরিচালনা তথা সম্পন্ন করা আল্লাহ সবুহানাহু তায়ালার বিধানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী বৈ কিছু নয়।

এ প্রসঙ্গে মহান রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেন “(হে রাসূল) তুমি কি কখনো চিন্তা করেছো যারা নিজের মনের বাসনা লালসাকে আপন ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে এরূপ ব্যক্তিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব তুমি কিভাবে নিতে পার (আল কুরআন)।”

পবিত্র কুরআন হাদিসের দৃষ্টিতে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার ইচ্ছাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য ও একমাত্র সংবিধান হিসেবে মেনে নিয়ে মানব সমাজে তা বাস্তবায়নের শপথ গ্রহণই হলো রমযান মাসের আসল শিক্ষা। এ জন্যই রমযানের সিয়াম সাধনাকারীর প্রকৃত সম্পর্ক অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি সিয়াম পালনকারী তা সরাসরি আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে হাদিসে কুদসীতে বর্ণনা করা হয়েছে, মহান রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেন আসসাওমূলী ওয়া আনা আজিজিবিহি অর্থাৎ রোজা আমার জন্যই আর আমি এর পুরস্কার দান করবো (সহীহ আল বুখারী)।

এ থেকে বোঝা যায় যে, বিশ্ব প্রভু মানব জাতিকে যে খিলাফাতের দায়িত্ব দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন তার যথার্থ প্রশিক্ষণ রমযানুল মুবারকের সিয়াম সাধনায় নিহিত রয়েছে। রমযানুল মুবারক দ্বিতীয় যে কারণটির জন্য গৌরবের অধিকারী তাহলো এ মাসেই সর্বশেষ আসমানী কিতাব পবিত্র কুরআনুল কারীম নাযিল হয়েছিল। আর এই অবিকৃত তথা অসাধারণ প্রন্থখানা হলো বিশ্বজাহান পরিচালনার একমাত্র আল্লাহ প্রদত্ত আইন বা জীবন বিধান।

এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন “এ রমযান মাসে পবিত্র কুরআনুল কারীমকে অবতীর্ণ করা হয়েছে যা মানুষের জন্য পথনির্দেশক এবং উজ্জ্বল হিদায়েত ও সত্য এবং মিথ্যার পার্থক্যকারী (আল কুরআন সূরা আল বাকারা)।”

পবিত্র কুরআনুল কারীম নাযিল হবার পর বিশ্বে যে বিপ্লব শুরু হয় তা ছিল বিশ্ব সভ্যতার এক অতুলনীয় মাইলফলক। বিশ্বের শিক্ষা, সংস্কৃতি, জ্ঞান চর্চা, দর্শন, আধ্যাত্মিকতা, সামাজিকতা, বিচারব্যবস্থা, নৈতিকতা ও প্রশাসনের সার্বিক দিকসমূহের যে আমূল পরিবর্তন হয় তার নজির কোথাও নেই। (চলবে)

লেখক : শায়েখ আহমাদুল্লাহ

একই রকম খবর