চাঁদপুরের অধ্যক্ষ ফেন্সি হত্যায় ব্যবহৃত হয় ‘তালা ও ফল কাটার চাকু’

স্টাফ রিপোর্টার ॥ চাঁদপুরের আলোচিত অধ্যক্ষ শাহিন সুলতানা ফেন্সি হত্যাকা-ের জট খুলতে শুরু করেছে। লোমহর্ষক এ খুনের ঘটনায় সরাসরি জড়িত এক মেডিকেল ছাত্রকে আটক করেছে ডিবি পুলিশ। তাদের স্বীকারোক্তিতে হত্যাকা-ে ঘরে থাকা দরজার তালা ও ফলকাটার চাকু ব্যবহারের বিষয়টি উঠে এসেছে।

আটককৃত ব্যক্তি খুনের দায় স্বীকার করে হত্যাকা-ের বর্ণনা দিয়ে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। রাকিব (২৩) নামের এ অভিযুক্ত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ছাত্র ।

নির্ভযোগ্য সূত্রে জানা যায়, অধ্যক্ষ ফেন্সির স্বামী অ্যাড. জহিরের দ্বিতীয় স্ত্রী জুলেখা বেগমের চাচাতো ভাই রাকিব ও তার এক সহযোগী হত্যাকা-ে সরাসরি জড়িত। তার বাড়ি মতলব উত্তর উপজেলার রাঢ়ী কান্দি এলাকায়। পিতা আব্দুল্লাহ আল মামুননের এক মাত্র সন্তান রাকিব।

পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঠা-া মাথায় অধ্যক্ষ ফেন্সিকে খুন করে খুনের আলামতও নষ্ট করে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করে অভিযুক্তরা।

রাকিব ও তার এক সহযোগীসহ (নাম জানা যায়নি) ঘটনার দিন ইফতারের পর পরই অধ্যক্ষ শাহীন সুলতানার ষোলঘরের বাসায় যায়। এ সময় তারা বাসার দরজায় দাড়িয়ে অ্যাড. জহিরুল ইসলামের খোঁজ করেন এবং অধ্যক্ষ ফেন্সিকে জানান, তারা বিদেশ যাওয়ার কাগজপত্র অ্যাড. জহিরকে দেখাতে এসেছেন।

অ্যাড. জহির বাসায় নেই বলার পরপরই খুুনিরা অত্যন্ত ভদ্র ভাষায় বাসার ওয়াশরুম (টয়লেট) ব্যবহার করার জন্য অনুমতি চান। একজন নিজেকে মেডিকেল শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দেয়।

এ সময় অধ্যক্ষ ফেন্সি তাদের বলেন, ‘আমার মেয়েও ডাক্তার। তোমরা ইফতার করেছো কিনা, খেয়েছো কিনা? ডাইনিং এ খাবার আছে খেয়ে নেও।’

দুইজন তখন ডাইনিং বসে খেজুর খায়। পরম মমতায় অধ্যক্ষ ফেন্সি তাদের আপ্যায়ন করাতে থাকেন। এ সময় এক খুনি বাসার তালা দিয়ে অধ্যক্ষ ফেন্সির পেছন থেকে মাথায় আঘাত করলে তিনি বাসার ফ্লোরে লুটিয়ে পড়েন। এর পর দুজনে মিলে তালা ও বাসার ফলকাটা চাকু দিয়ে মাথায় আরো কয়েকটি আঘাত করে। হত্যা নিশ্চত করতে পলিথিন দিয়ে মুখ পেছিয়ে ধরে। মৃত্যু নিশ্চত হবার পর খুনিরা বাসার বাথরুমে প্রবেশ করে হাত মুখ ধুয়ে বেরিয়ে লঞ্চঘাটে চলে যায়।

এ সময় অভিযুক্ত রাকিবের হাত কেটে যায়, প্যান্টে রক্তের দাগ লেগে থাকে। দুই খুনি ইমাম হাসান লঞ্চে উঠে। লঞ্চে উঠার আগে ঘাট থেকে ব্যান্ডেজ ক্রয় করে। রাতের লঞ্চে চলে যায় ঢাকা। ঢাকা থেকে অভিযুক্তদের একজন চাঁদপুর চলে এলেও রাকিব চলে যায় গাজীপুর।

খুন করার পর থেকে এই দুইজনের কেউই কারো সাথে মোবাইলে আর যোগাযোগ করে নাই। তথ্য প্রযুক্তির সাহায্যে আটক করা হয় রাকিবকে। এর আগে খুনের দিন সকালে দুইজন ঢাকা থেকে চাঁদপুর আসে। তারা শহরের হাসান আলী স্কুল মাঠসহ বিভিন্ন স্থানে বৈঠক করে খুনের পরিকল্পনা এবং নকশা করতে থাকে।

ইফতারের পর কিলিং মিশনে যায়। রাকিবের সাথে জুলেখা ও জহিরের নিয়মিত যোগাযোগ ছিলো ও নিয়মিত মোবাইলে কথা বলতো।

পুলিশ জানিেেয়ছে হত্যাকা-ের সাথে অ্যাড. জহির সম্পৃক্ততা কতোটুকু তা নিশ্চত করার জন্য আরো ব্যাপক তদন্ত প্রয়োজন। এ খুনের সাখে সর্বমোট কতোজন জড়িত তা এখনো নিশ্চত করে বলেনি পুলিশ
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশ পরিদর্শক মহিউদ্দিন জানিয়েছেন, তদন্তের স্বার্থে অনেক কথাই বলা যাচ্ছে না । তবে মামলার রহস্য উদঘাটন হয়েছে। এটা স্পষ্ট খুন। বাকী আসামীদেরও দ্রুত সময়ে আটক করা সম্ভব হবে বলেও তিনি জানান ।

এদিকে বুধবার (২৭ জুন) পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আকস্মিক ও সংক্ষিপ্ত প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার জানান, ‘চাঞ্চল্যকর হত্যায় মামলায় অধ্যক্ষ ফেন্সির স্বামী অ্যাড. জহির ও তার ২য় স্ত্রী জুলেখা খুনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারী হিসেবে আমাদের কাছে তথ্য উপাত্ত রয়েছে। এ বিষয়ে আরো তদন্ত হবে। এতে আর কেউ জড়িত আছে কিনা তা আমরা খতিয়ে দেখছি।’

জহিরুল ইসলাম আদালতে জানিয়েছেন “স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্যে পুলিশ তাকে বলপ্রয়োগ ও নানা হুমকি দমকি দিচ্ছেন” সাংবাদিকদের এ ধরনের এক প্রশ্নে পুলিশ সুপার জানান, ‘এটি মিথ্যা, আমরা তাকে আইনগতভাবেই জিজ্ঞাসাবাদ করছি। তিনি হয়তোবা আতঙ্কবোধ করতে পারেন’।

প্রসঙ্গত, কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামীলীগ নেত্রী ও গল্লাক ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ শাহীন সুলতানা ফেন্সি খুনের পর পরই পুলিশ তার স্বামী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম ও দ্বিতীয় স্ত্রী জুলেখা বেগমকে আটক করে।

গত ৪ জুন নিজ বাসায় হত্যাকা-ের শিকার হন তিনি। রাত সাড়ে ১০টায় পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। তার মাথায় মারাত্মক যখম ও শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিলো।

এ ঘটনায় পরদিন অধ্যক্ষ ফেন্সির ছোট ভাই ফোরকান থান বাদী হয়ে সদর থানায় মামলা করেন। এর পর থেকেই জেল হাজতে রয়েছে অ্যাড. জহিরুল ইসলাম ও জুলেখা জহির।

জহিরুল ইসলাম আনুমানিক চার বছর আগে সবার অগোচরে জুলেখা বেগমকে বিয়ে করেন। জুলেখার আগেও বিয়ে হয়েছিল। সেই ঘরে তাঁর দুই সন্তান রয়েছে। অ্যাড. জহিরুল ইসলামের সাথে জুলেখা বেগমের বিয়ে পরবর্তী কন্যা সন্তানের জন্ম হয় ।

অন্যদিকে খুন হওয়া অধ্যক্ষ শাহীন সুলতানা ফেন্সির তিন কন্যা। তিন জনেরই বিবাহ হয়েছে। দুই মেয়ে দেশের বাইরে থাকেন। এক মেয়ে চিকিৎসক। তিনি দেশে থাকেন।

হত্যাকাণ্ডে পর থেকে দুই মেয়েসহ অধ্যক্ষ ফেন্সির পরিবারের সদস্যরা সংবাদ সম্মেলন করে খুনের বিচার দাবি করেন এবং হত্যাকা-ের সাথে অ্যাড. জহির ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী জড়িত বলে দাবি করেন।

একই রকম খবর

Leave a Comment