ফরক্কাবাদ উবির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হান্নান মিজির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু

স্টাফ রিপোর্টার : চাঁদপুর সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ফরাক্কাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ হান্নান মিজির নানা অনিয়মের বিষয়ে গতকাল ২৬ জুন শিক্ষা অধিদপ্তর কুমিল্লা থেকে তদন্ত শুরু হয়েছে ।

কুমিল্লা শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সুমের কর চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি সরজমিনে ফরাক্কাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ে যান এবং তদন্ত করেন । তদন্তকালে বিদ্যালয়ের বর্তমান অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ হান্নান মিজির কোন কাগজপত্র দেখাতে পারিনি ।

প্রাথমিকভাবে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে তদন্তকারী দল বলে নির্ভরযাগ্য সূত্র জানিয়েছে ।
এ ব্যাপারে চাঁদপুর সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো:কামাল হোসেন গতকাল ২৬ জুন রাতে দৈনিক চাঁদপুর খবর কুমিল্লা শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সুমের কর চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি ফরাক্কাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ে যান এবং তদন্ত করেন ।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ফরাক্কাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ হান্নান মিজির নানা অনিয়মের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রনালয়ে অভিযোগ দাখিল করা হয় । সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষামন্ত্রনালয়ের নির্দেশিত হয়ে শিক্ষা অধিদপ্তর কুমিল্লা থেকে তদন্ত শুরু হয়েছে ।

জানা গেছ, ১৯৯৫ সালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চাকরী বিধি না মেনে জালিয়াতির মাধ্যমে করণিক হিসেবে নিয়োগ পান। নিয়োগ প্রক্রিয়াটি নিয়ম বহির্ভুত থাকলেও পর্যায়ক্রমে দুর্নীতির মাধ্যমে সহকারী শিক্ষক হিসেবে একই বিদ্যালয়ে যোগদান করেন।

এরপর সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং সর্বশেষ তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে। তার করণিক থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পর্যন্ত সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া জালিয়াতি এবং বড় ধরণের এক দুর্নীতি। তিনি প্রতারণা করে এই পর্যন্ত সরকারের ৮২ লাখ টাকার অধিক আত্মসাৎ করেছেন। এসব ঘটনায় বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্য তার বিরুদ্ধে চাঁদপুর আদালতে দুটি পৃথক মামলা করেছেন। একই সাথে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এর মহাপরিচালকসহ সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

জানা গেছে,সম্প্রতি দুর্নীতিতে অভিযুক্ত শিক্ষক হান্নান মিজির দীর্ঘ প্রায় ২৮ বছরের জালিয়াতির সব ধরণের কাগজপত্র ও মামলার কপি গণমাধ্যমের হাতে এসেছে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানাগেছে, হান্নান মিজি ১৯৯৫ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জালিয়াতি ও প্রতারণা করে বিদ্যালয়ে করণিক, সহকারী শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও বিগত দিনের পরিচালনা পর্ষদ একজন প্রভাবশালী নেতার কারণে কোন ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, এ নেতা আবার মোঃ হান্নান মিজির বাল্যবন্ধু ও একসাথে উক্ত বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। আইনগত ব্যবস্থা না নেয়ায় দায়িত্ব অবহেলার মধ্যে পড়েন প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক/সদস্য সচিবরাও।

তার এসব জালিয়াতির খোঁজ ও তথ্য জানতে পেরে বিদ্যালয়ের সর্বশেষ পরিচালনা পর্ষদের অভিভাবক সদস্য মোঃ জাহাঙ্গীর হোসাইন বাদী হয়ে চাঁদপুর আদালতে নির্দিষ্ট জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে হান্নান মিজির বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করেন (মামলা চলমান)। একই সাথে তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এর মহাপরিচালক বরাবর বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে অভিযোগ করেন।

মামলা ও অভিযোগের বিবরণ থেকে জানাগেছে, ১৯৯৫ সালে হান্নান মিজি বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী করণিক হিসেবে নিয়োগ পান। কিন্ত ওই নিয়োগ ওই সময়কার চাকরী বিধির নিয়ম গোপন রেখেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এরপর ১৯৯৯ সালের ৩১ মে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের ৩১তম সভায় সিদ্ধান্ত ছিল ৩জন শিক্ষককে মাষ্টার রুলে নিয়োগ প্রদান। তারা হলেন- ক. মো. মাসুদুর রহমান তপদার, খ. মোজ্জাম্মেল হক ঢালী ও গ. মো. জাহাঙ্গীর আলম। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে মোঃ হান্নান মিজির মাস্টার রোলে নিয়োগের কথা রেজুলেশনে উল্লেখ ছিলনা। সভার পরে প্রভাব খাটিয়ে ‘ঘ’ বর্ণ ব্যবহার করে ৪র্থ ব্যাক্তি হিসেবে নিয়োগ দেখান হান্নান। রেজুলেশনে লেখা মুছে আবার নতুন করে অন্য হাতের লেখা খুবই স্পষ্ট। এই জালিয়াতি থেকে শুরু করে বাকী পদে চাকরীর চূড়ান্ত পর্যায়ের দুর্নীতিতে অবতীর্ণ হন তিনি।

এই রেজুলেশনের উপর ভিত্তি করে হান্নান পরবর্তীতে সহকারী শিক্ষক হিসেবে এমপিওভুক্ত হন। কিন্তু সহকারী শিক্ষক হিসেবে এমপিওভুক্ত হওয়ার জন্য ওই সময়কার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিধি ২০৩ অনুযায়ী স্নাতকসহ বিএ, বিএড সকল পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেনী/বিভাগ থাকতে হবে। কিন্তু হান্নান মিজির সনদপত্রে স্নাতক সম্পূরক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, এইচএসসি তৃতীয় ও এসএসসিতে দ্বিতীয়। এইসব তথ্য গোপন রেখে এবং প্রভাব খাটিয়ে ২০১৫ সালে তিনি আবার সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান।

জালিয়াতি এখানেই শেষ নয়, হান্নান মিজি করণিক পদ থেকে পদত্যাগ না করেই সহকারী শিক্ষক হিসেবে মাষ্টার রোলে নিয়োগ পান ১৯৯৯ সালে। এরপর তিনি ২০০১ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত জালিয়াতি করে করণিক ও সহকারী শিক্ষক হিসেবে সরকারিসহ সব ধরনের দুটি বেতন-ভাতা একই সঙ্গে সুবিধা গ্রহন করেন।

এদিকে, ২০১৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদটি শূন্য। কিন্তু মোঃ হান্নান মিজি অবৈধভাবে প্রভাব খাটিয়ে প্রধান শিক্ষকের পদটিও ভারপ্রাপ্ত প্রদান শিক্ষক হিসেবে দখল করে আছেন। বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ বার বার প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদটি পূরণ করার জন্য চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এতেও ক্ষান্ত না হয়ে হান্নান মিজি প্রধান শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াটি বন্ধ করে রেখেছেন।

অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. হান্নান মিজি এই বিষয়ে বলেন, আমার সনদপত্র যা দেয়া আছে তা সঠিক। আমি বিএ,বিএড পাশ করেছি। কোন ধরণের প্রতারণা কিংবা জালিয়াতি করিনি। তবে করণিক পদ থেকে অব্যাহতি না দিয়েই সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পেয়েছি। যদি অব্যাহতির পর সহকারী শিক্ষক নিয়োগ না হত, তাহলে আমি চাকরী হারাতাম। যে কারণে অব্যাহতি দেইনি। তবে আমি কোন কাজেই প্রভাব খাটাইনি। বরং সাবেক প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন হাওলাদার আমার নিয়োগের রেজুলেশন বুক বুঝিয়ে দেননি। যার কারণে আমি থানায় জিডি করেছি।

মামলার বাদী মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন বলেন, হান্নান মিজির প্রথম করনিক পদে নিয়োগই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চাকরী বিধির মধ্যে হয়নি। যার ফলে গত ২৭ বছর তিনি সরকারের যে বেতন ভাতা ভোগ করেছেন তার পরিমান প্রায় ৮২ লাখ টাকার অধিক। ইতোমধ্যে তার জালিয়াতির কয়েকটির প্রমাণ আদালতে শিক্ষা কর্মকর্তা তদন্ত শেষে মতামত দিয়েছেন।

একই রকম খবর