মতলবের ক্ষীর বিক্রি করে সাবলম্বী বিউটি রানী ঘোষ

সমির ভট্টাচার্য্য : বাড়িতে বসে ক্ষীর তৈরি করছেন বিউটি রানী। সম্প্রতি তোলা ছবি বাড়িতে বসে ক্ষীর তৈরি করছেন বিউটি রানী ঘোষ ছোটবেলা থেকে অসচ্ছল পরিবারে বিউটি রানী ঘোষের (৩৮) বেড়ে ওঠা। স্বপ্ন দেখতেন, নিজে কিছু করবেন। কিন্তু আর্থিক সমস্যায় অষ্টম শ্রেণির পর আর পড়তে পারেননি। ২০০৬ সালে বিয়ে হয়ে যায় তাঁর।

তবু দমে যাননি। বিয়ের পর স্বামীর ক্ষীরের ব্যবসায় সহযোগিতা করেন। একসময় সিদ্ধান্ত নেন, নিজেই ব্যবসা করবেন। সেই লক্ষ্যে আশপাশের নারীদের নিয়ে গড়ে তোলেন একটি সমিতি। ২০১২ সালে পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) থেকে ১৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শুরু করেন ব্যবসা।

নিজ হাতে ক্ষীর বানিয়ে লাভের মুখ দেখেন বিউটি। সংসারে ফেরে সচ্ছলতা। গুণমান আর অনন্য স্বাদে বিউটির বানানো ক্ষীর ভোজনরসিকদের কাছে সমাদৃত। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে প্রবাসীরাও লোক মারফত ক্ষীরের ফরমাশ (অর্ডার) দেন।

ক্ষীরের ব্যবসা করে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি বিউটি কুড়িয়েছেন সুনাম ও পুরস্কার। গত বছর উপজেলার সেরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে পেয়েছেন জাতীয় পল্লী উন্নয়ন পদক। মহিলা অধিদপ্তর থেকে পান জয়িতা পুরস্কার। তাঁর দেখাদেখি অনেক নারী উদ্যোগী হচ্ছেন।

বিউটি রানী ঘোষ (৩৮) চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার ঘোষপাড়া এলাকার উৎপল কুমার ঘোষের স্ত্রী। পৈতৃক বাড়ি জেলা শহরের পুরানবাজার এলাকায়। তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, টিনের তৈরি বসতঘরের এক পাশে চলছে ক্ষীর বানানোর প্রক্রিয়া।

লাকড়ির চুলায় বড় একটি কড়াইয়ে দুধ গরম করছিলেন বিউটি ও এক নারী শ্রমিক। তৈরি করা ক্ষীর বাজারজাতের জন্য মাটির সানকিতে রাখছেন। ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে চারপাশে। সেখান থেকে ক্ষীরের পাতিলগুলো নিয়ে যাচ্ছেন তাঁর স্বামী। উপজেলা সদর বাজারে তাঁদের ‘আনন্দ দধি-ক্ষীর হাউস’ নামের একটি দোকান আছে।

কাজের ফাঁকে ফাঁকে নানা স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার গল্প শোনালেন বিউটি। ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। তাঁর শৈশব কেটেছে অভাবে। ইচ্ছা ছিল পড়ালেখা করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। কিন্তু আর্থিক জটিলতায় সেটাও বেশি দূর এগোয়নি। ১৬ বছর আগে বিয়ে হয়ে যায়। তবু হাল ছাড়েননি। সিদ্ধান্ত নেন, ব্যবসা করবেন। প্রথমে আশপাশের ২০ নারীকে নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। বিআরডিবি থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন।

বিউটি বলেন, লাকড়ির চুলায় চিনি ও দুধের অনুপাত ঠিক রেখে ক্ষীর বানানোয় দ্রুত তাঁর ক্ষীরের সমাদর বেড়ে যায়। ক্ষীরের ব্যবসা করে সংসারে সচ্ছলতা ফেরে। কয়েক দফা ঋণ নিয়ে ব্যবসার পরিধি বাড়ান। এখন প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ কেজি ক্ষীর বানিয়ে বিক্রি করেন। মাসে গড় বিক্রি তিন লক্ষাধিক টাকা। লাভ থাকে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা।

চাঁদপুর, কুমিল্লা, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাঁর ক্ষীর পৌঁছে যাচ্ছে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকেও ফরমাশ পাচ্ছেন। প্রতি কেজি ক্ষীর বানাতে ৩৫০ টাকা খরচ হয়। বিক্রি করেন ৪০০ টাকায়।

বিউটি জানান, ক্ষীরের ব্যবসা করে সাত শতক জমি কিনেছেন। সেখানে বাড়ি করবেন। তাঁর দেখাদেখি শংকরী, তুলসী রানী ঘোষসহ আরও ৩০ নারী ক্ষীরের ব্যবসা করে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা আবুল হাসনাত বলেন, বিআরডিবি থেকে ঋণ নিয়ে বিউটি যেভাবে ক্ষীরের ব্যবসা করে স্বাবলম্বী হয়েছেন, তা তাঁর লড়াকু মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। তাঁর দেখাদেখি স্বনির্ভর হয়েছেন আরও অনেক নারী।

একই রকম খবর