মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিকদের উপর বর্বরতা বন্ধ হোক

সংসারের অভাব অনটন আর দারিদ্রতার অদৃশ্য শিকল থেকে মুক্তি পেতে, উন্নত জীবনের আশায় পরিবার-পরিজন ছেড়ে প্রতিবছরই উল্লেখসংখ্যক বাংলাদেশী নারী শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমাচ্ছে।

অথচ ভাগ্যের নির্মমতায় সেখানে গিয়ে অমানবিকতার নগ্ন খাঁচায় আটকা পড়েছে তারা। ফলে কিন্তু বছর না যেতেই এই অমানবিক নগ্ন খাচার বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেতে ডানা ঝাঁপটে বেড়াতে থাকে। ভাগ্য ভালো হলেই কেবল হাতে গোনা কেউ কেউ এমন জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে ফিরে আসে বাংলাদেশে।

আর যারা ব্যর্থ হয় তারা মাতৃভূমিতে ফিরে আসে লাশ হয়ে। গেলো কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া এবং ফিরে আসা ভাগ্যহত নারী শ্রমিকদের এমন করুণ গল্প শোনা যাচ্ছে মিডিয়াজুড়ে।

দালাল আর রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর খপ্পরে পড়ে ভাগ্যহত এই নারী শ্রমিকরা একদিকে যেমন সর্বস্বান্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে সহ্য করছেন নরক যন্ত্রণা। বেসরকারি সংস্থা ব্রাক এর অভিভাসন কর্মস‚চির পরিসংখ্যানে জানা যায়, চলতি বছরে সৌদি আরব থেকে ৪৮ জন বাংলাদেশী নারী গৃহকর্মির মৃতদেহ দেশে আনা হয়েছে।

এদের মধ্যে আবার ২০জনই নির্যাতনের অভিযোগ তুলে সৌদি আরবে আত্মহত্যা করেছেন। সংস্থাটি বলেছে, সৌদি আরবে গৃহকর্মির কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের কারণে বাংলাদেশী নারীদের মৃত্যুর ঘটনাগুলোর কোন বিচার হচ্ছে না।

আরো একটি বেসরকারি সংস্থা বলেছে, সেখানে ধর্ষণসহ নানা ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে এবছর ৯০০ জনের মতো বাংলাদেশী নারী গৃহকর্মি দেশে ফেরত এসেছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযয়ী, এক শ্রেণীর দালাল আর রিক্রুটিং এজেন্সিগু অসহায় নারীদের গৃহশ্রমিক, নার্স, পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কাজের জন্য আকর্ষণীয় বেতনের লোভ দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নিয়ে তাদের দেহ ব্যবসায় বাধ্য করা হচ্ছে।

শুধু তাই নয়, কারো কারো ভাগ্যে গৃহকর্মীর কাজ জুটলেও ওই বাড়ির গৃহকর্তা কতৃক যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তারা। প্রতিবাদ করলেই এসকল নারী শ্রমিকদের ওপর নেমে আসছে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন। বেতন না দিয়ে দিনের পর দিন তাদের অভুক্ত পর্যন্ত রাখা হচ্ছে।

সেখানে নারীদের অনেকটা মধ্যযুগীয় কায়দায় দাস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। স¤প্রতি বিবিসি নিউজ অ্যারাবিক’র এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েতে বাংলাদেশী নারী শ্রমিকদের ভয়াবহ চিত্র। সেখানে এইসব ভাগ্যাহত নারীদের দাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাদের আটকে রাখা হয় বদ্ধঘরে। যেখানে তাদের সব ধরনের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকে তারা। ঘরের গন্ডির বাইরে বেরোতে পারে না।

বিকিকিনির মাধ্যমে শুধু হাত বদল হয়। এ খবর প্রকাশের পর কুয়েত কর্তৃপক্ষ দাস ব্যবসার বিরুদ্ধে সীমিত পরিসরে ব্যবস্থা নিয়েছে বলেও জানানো হয় ওই প্রতিবেদনে। এসব বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ দ‚ত উর্মিলা ভুলা বলেন, তারা (গুগল, ফেসবুক, অ্যাপল) ম‚লত অনলাইন দাসী বাজারকে প্রমোট করছে। এমন অ্যাপ যদি তাদের প্ল্যাটফর্মে থাকে, তাহলে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। এগুলো আধুনিক দাস প্রথার নমুনা।

এখন কথা হচ্ছে এই বিষয়ে দেখা কী কেউ নেই। যেসকল দালাল বা রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো এসকল ভাগ্যহত নারীদের জীবন নিয়ে খেলছে তাদের বিষয়ে সরকার কিংবা প্রশাসনের দায় কী নেই। তাছাড়া রাষ্ট্র কিংবা প্রশাসনের পাশাপাশি ভুক্তভৌগী নারী এবং তাদের পরিবারই বা কতটুকু ভূমিকা পালন করছে। যদি এই দুটি পক্ষ তাদের দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করতো তকে দালাল আর রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিশ্চই নারীদের নিয়ে এই জঘন্যতম ব্যবসায় বেশিদিন টিকে থাকতে পারতো না।

যেসকল নারীরা উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করে বিদেশে নারী শ্রমিক হয়ে পা রাখছেন, তারা যদি ওই টাকায় দেশেই ছোটখাট কাজ করেন তকে খুব বেশী অলাভজনক হতো না। কারণ বর্তমানে নারীকের হস্তশিল্প, বিউটিশিয়ান, ট্রেইলাসসহ নানান কাজের দ্বায় উন্মোচিত হয়েছে।

এছাড়াও বর্তমান সরকার নারীরে অগ্রযাত্রায় নানামুখি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। যার ফলে দেশে নারীদের প্রচুরপরিমানে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। তার পরেও মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিক পাঠানো দালাল বা রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বদনাম রাষ্ট্র কোনো তার ঘারে নিচ্ছে। সচেতন মানুষ মনে করে অবিলম্ভে সরকার এই বিষয়টি নজরে এনে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। লেখক পরিচিতিচি: সবিত্রী রাণী ঘোষ, সাংবাদিক ও লেখক, সম্পাদক: পাক্ষিক চাঁদনগর।

একই রকম খবর