যে কারণে নৌকায় ভোট দিবেন

“দ্বিতীয় পর্ব”

‘‘দুর করব নিরক্ষরতা, জয় করব জরা ব্যাধি।’’

আর নয় অশিক্ষা, অঞ্জানতা অন্ধকার যুগের অবসান হল। শিক্ষার আলোয় আলোকিত আমার দেশের প্রান্তিক জনগন। বিনা চিকিৎসায় আর কেউ মারা যাবেনা। শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা এখন আর শহর কেন্দ্রিক নয়, ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সব দূর্গমঅঞ্চলে। তাই এই পর্বে আওয়ামী লীগ সরকার চিকিৎসা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে যে সব উন্নয়ন করেছেন তার চিত্র পাঠকদের সামনে তুলে ধরব। আমার লেখার প্রথম পর্বে বাংলাদেশের খাদ্য ও বিদ্যুৎ খাতে জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন কর্মকাÐ গুলো তুলে ধরেছিলাম।

অন্যান্য খাতের মতো চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। কারণ স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। গত দশবছরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ১৮ হাজার ৬শ’ ৬৫ জন চিকিৎসক নিয়োগ দিয়েছে। চিকিৎসক, নার্স, ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীর পথে সরকার ৮১ হাজার ৩শ’ ২৪ জনকে নিয়োগ দিয়েছে। নার্সদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থা বর্তমান সরকারের যুগান্তকারী উদ্যোগ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থা চালু করেন। এর শ্লোগান হল ‘শেখ হাসিনার অবদান কমিউনিটি ক্লিনিক বাঁচায় প্রাণ’। বর্তমানে সারাদেশে ১৩ হাজার ৩শ’ ৩৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। এসব ক্লিনিক থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে এবং উপকৃত হচ্ছে। শেখ হাসিনার উদ্যোগে চিকিৎসা ব্যবস্থায় আরো আধুনিকায়ন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ সারাদেশে টেলিমেডিসিন সেবা চালু করণ। এর ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও এখন সহজেই চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে।

বর্তমানে প্রতি জেলায় মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চাঁদপুরসহ কয়েকটি জেলায় মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। এতে করে শিক্ষার্থীরা মেডিকেলে পড়তে পারবে এবং জেলাবাসীকে চিকিৎসা সেবা দিতে সক্ষম হবে। সিভিল সার্জন ও উপজেলায় সরকারি গাড়ী দেওয়ার পাশাপাশি নদীবেষ্টিত অঞ্চলে নৌ-অ্যাম্বুলেন্স দিয়েছে সরকার। ইন্টানি ভাতা আগে ৬ হাজার ৫শ’ টাকা ছিল। জননেত্রী শেখ হাসিনা ইর্ন্টানি ভাতাকে ১৫ হাজার টাকা করেন। সরকার সকল জেলা হাসপাতালকে ২৫০ শয্যা, ২৫০ শয্যাকে ৫০০ শয্যা এবং ৫০০ শয্যা কে ১০০০ শয্যায় উন্নীত করেছে। এছাড়াও জেলা হাসপাতালে সিসিইউ ও আইসিইউ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

অন্যদিকে দেশের ওষুধ উৎপাদনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। আমাদের চাহিদার ৯৮% ওষুধ এখন দেশেই তৈরি হয়েছে। আবার দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে এখন ওষুধ আমেরিকা ও ইউরোপসহ অনান্য দেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে। পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশের ওষুধ এখন বিশে^র ১৩৫টি দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। দেশের প্রতিটি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন করা হয়েছে। ঢাকাসহ প্রতিটি জেলায় এখন মডেল ফার্মেসী করা হয়েছে। এ সমস্ত উদ্যোগ নেওয়ার কারণে দেশে এখন শিশু মৃত্যুর ও মাতৃমৃত্যুর হার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

বিগত দিনে আওয়ামী লীগ সরকার স্বাস্থ্যখাতকে জনবান্ধব করতে কাজ করে গেছে। ‘জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি’ প্রনয়ণ আওয়ামী লীগ সরকারেরই অবদান। সরকার এছাড়াও বিভিন্ন সাস্থ্যবান্ধব আইন প্রনয়ণ ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করেছে। এন্টিবায়োটিক, ভিটামিন, হরমন ও ক্যান্সারের কাচাঁমলের উপর হতে ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে। গর্ভবতী মায়েদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি আওয়ামী লীগ সরকার ৬ মাস করেছে। দরিদ্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোতে সহায়তা ভাতা প্রদান করা হচ্ছে।

সরকার শারীরিক প্রতিবন্ধী আইন ২০১৩, মানসিক ও স্নায়ুগত প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষা আইন ২০১৩, মানসিক স্বাস্থ্য আইন প্রণয়ন করেছে। পাশাপাশি খাদ্যে ভেজাল রোধে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। বিশুদ্ধ খাদ্য আইন ২০১৩ জারি হয়েছে। ফরমালিন মেশানো বন্ধে ২০১৫ সালে সরকার ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন জারি করেছে। ফরমালিন আমদানিও নিয়ন্ত্রিতভাবে হচ্ছে। স্বাস্থ্যখাতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধনের ফলে মানুষের এখন গড় আয়ু বেড়েছে অনেক। বর্তমানে মানুষের গড় আয়ু ৭১.২০ বছর। স্বাস্থ্যখাত নিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার আরো অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। ঔষধ প্রশাসন পরিদপ্তরকে অধিদপ্তরে রূপান্তর করা হয়েছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এখন বিশ^মানের সেবা দিচ্ছে। এসব উন্নয়ন কর্মকাÐ অব্যাহত রাখতে হলে শেখ হাসিনার নেতৃত¦াধীন আওয়ামী লীগ সরকারকে ভোট দেওয়ার বিকল্প নাই।

দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে শিক্ষা অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি উন্নতি লাভ করতে পারেনা। শেখ হাসিনা সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শিক্ষার উপর গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দেশে সাক্ষরতার হার অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৮ সালে দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ৪৬.৬৬%। বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৭২.৭৬%। অর্থাৎ গত ১০ বছরে বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার বেড়েছে ২৬.১০%। পত্রিকা পড়ে জানতে পারলাম ভারতে সাক্ষরতার হার ৬৯.৩০%, নেপালে ৫৯. ৬৩, ভুটানে ৫৭.০৩% এবং পাকিস্তানে সাক্ষরতার হার ৫৬. ৯৮%।

সাক্ষরতার দিক দিয়ে বাংলাদেশ এসব দেশ থেকে অনেকটাই এগিয়ে আছে। প্রতিবছরেই সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে বাজেট বাড়িয়েছে। ২০০৮ সালে বাজেটে শিক্ষাখাতের জন্য রাখা হয়ে ছিল এক হাজার ৯৯৩.৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার। ২০১৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ৪ হাজার ৩৯৯.৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার ব্যয় করে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষাক্ষেত্রে ৭ হাজার ৮শ’ ৮৫ মিলিয়নেরও বেশি ডলার বরাদ্দ রেখেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। অর্থাৎ ৬৫ হাজার ৪শ’ ৪৪ কোটি টাকা শিক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ ছিল। ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষা নীতি প্রণয়ন করেছে সরকার। এই নীতিমালায় শিক্ষাক্ষেত্রে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল।

এছাড়াও শ্রেণিকক্ষ ও পাঠ্যপুস্তক আধুনিকায়ন, শিক্ষাক্রম সংস্কার, সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি চালু, অবকাঠামোগত উন্নয়নের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন দেশে প্রাথমিক স্তরে শিশু ভর্তির হার প্রায় ১০০%। অথচ ৮ বছর পূর্বে এই ভর্তির হার ছিল ৬১%।

২০১৭ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৯৬% শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত করেছে সরকার। বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া জননেত্রী শেখ হাসিনার আরেকটি মহত উদ্যোগ। এটি জাতীয় পাঠ্যপুস্তক উৎসব নামে পরিচিত। ২০১০ সালে সরকার ২ কোটি ৫০ লক্ষ শিক্ষার্থীর মাঝে বিনামূল্যে পাঠবই প্রথম বিতরণ করে। ২০১৮ সালে প্রায় ৪ কোটি ৪৬ লক্ষ শিক্ষার্থী বছরের প্রথম দিনে নতুন বই পেয়েছে। ছাত্র-ছাত্রী যে ৮ বছরের দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে তা এই পরিসংখ্যান দেখলেই বুঝা যায়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগ উপযোগি করেছেন। মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর স্থাপন করা হয়েছে। কওমি মাদ্রাসার দাওরা হাদিস স্তরকে মার্স্টাসের সমমান দেয়া হয়েছে। ইসলামি আরবি বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে ডিজিটাল ল্যাব দেওয়া হয়েছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের মাধ্যমে ক্লাস করছে শিক্ষার্থীরা।

মিড ডে মিল চালু হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চায় উৎসাহিত করতে বছরব্যাপী আয়োজন রেখেছে সরকার। এতে করে পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্র ছাত্রীদের মনের যথাযথ বিকাশ হচ্ছে। সরকার বৃত্তির সুবিধা বাড়িয়েছে। সম্প্রতি প্রতিটি উপজেলায় একটি করে স্কুল ও কলেজকে সরকারি করন করা হয়েছে। শিক্ষকদের বেতন ভাতা, অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধি, কয়েক হাজার নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার।

সরকারি স্কুল কলেজের ন্যায় বার্ষিক ৫% ইনক্রিমেন্ট ও ২০% বৈশাখী ভাতা প্রদান করা হয়েছে। দেশে এখন শিক্ষক সংকট অনেক কমে এসেছে। শিক্ষার পরিবেশ উন্নত হওয়া শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেড়েছে। উচ্চ শিক্ষায় সেশন জট কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সেই উদ্যোগ সফল বাস্তবায়িত হওয়ায় সেশন জট কমেছে।

আগে পুরুষের তুলনায় নারীরা শিক্ষা বঞ্চিত ছিল বেশি। এখন শিক্ষা ক্ষেত্রে পুরুষদের সমানতালে নারীরা এগিয়ে চলছে। কোন কোন ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে। ফলে চাকরিতে নারীর অংশগ্রহণ কয়েকগুণ বেড়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রের এমন উল্লেখযোগ্য অনেক অবদান রাখার জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। তিনি দেশের হাল শক্ত করে না ধরলে চিকিৎসা, শিক্ষাসহ সবক্ষেত্রেই বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ত। অনেক উন্নয়নশীল দেশের চাইতে শিক্ষা ক্ষেত্রে আমরা এগিয়ে।

আমাদের দেশের শ্রমজীবি মানুষেরা তাদের সন্তানদের যে কোন আবস্থাতেই লেখাপড়া শেখাতে চায়। স্কুলে পাঠায়। এটি শেখ হাসিনার অবদান। অথচ কয়েক বছর আগেও দেশের প্রান্তিক ছেলেমেয়েরা অর্থ উপার্জন করতে যেত। গণতন্ত্রের মানসকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি বাংলাদেশের যে উন্নয়ন করেছেন তা বিগত কোনো সরকার করতে পারেনি। তার উন্নয়নের কথা বলে শেষ করা যাবেনা।

আজকের জন্যে এ পর্যন্তই। আবারও আহবান জানাই ‘৩০ ডিসেম্বর শুভদিন। উন্নয়নে অংশ নিন। নৌকায় ভোট দিন’। সেই সঙ্গে আমার লেখাটির প্রথম পর্ব পড়ে যারা আমাকে অনুভূতি জানিয়েছেন তাদেরকে ধন্যবাদ ও কৃতঞ্জতা জানাই। সবার মঙ্গল কামনা করি।
জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক : অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ হাসান খান;

সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, চাঁদপুর জেলা।

একই রকম খবর

Leave a Comment