সফল মুমিনের গুণাবলী

হাফেজ মোঃ আল-আমিন কাজী : মহান আল্লাহ তা’আলা অসংখ্য মাখলুক সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টির সংখ্যা এত বেশি যা সংখ্যায় নিরুপ করা প্রায় অসম্ভব। মহান আল্লাহ তা’আলা কোন বস্তুকে অপ্রোজনীয় সৃষ্টি করেননি, প্রতিটি সৃষ্টির পেছনে রয়েছে কোন না কোন উদ্দেশ্য, ঠিক তেমনি মহান আল্লাহ তায়ালা জিন এবং মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, এটি সৃষ্টি করারও মূল একটা উদ্দেশ্য আছে, তা হলো আল্লাহ তাআলার ইবাদত করা, দাসত্ব করা, এবং রাসূল (সা.) এর আদর্শিক জীবনকে পরিপূর্ণ ভাবে অনুসরণ করা।

যেহেতু মাখলুকাতের মধ্যে মানুষকেই শ্রেষ্ঠত্বের আসনে মনোনীত করেছেন তাই, মহান আল্লাহ তা’আলা মানুষের উপর মৌলিক কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, সে দায়িত্বগুলোর করণীয় এবং বর্জনীয় যথাযথ পালনের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করবে এবং এর বিনিময়ে পরকালীন জীবনে মহান আল্লাহ তা”আলা সেই সব প্রিয় মুমিন বন্দাদেরকে অনন্তকালের জন্য চিরসুখের আবাসস্থলের ব্যবস্থা করবেন।

সেই জান্নাত নামক চিরসুখের আবাসস্থলে পৌঁছানোর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদেরকে দেওয়া দায়িত্ব, এবং কর্তব্যকে যথাযথভাবে আদায় করাই হলো একজন সফল মুমিনের সফলতম কাজ। সম্মানিত পাঠক, আসুন আমরা জেনে নেই প্রকৃত মুমিনের পরিচয়, এবং তাদের গুণাবলী। যে ব্যক্তি মহান আল্লহ রাব্বুল আলামীনের একত্ববাদ ও রাসূল (সা.) এর রিসালাতে পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে বিশ্বাস স্থাপন করে তাঁর প্রতিটি হুকুম-আহকাম মেনে চলে তাকেই মুমিন বলে।

পবিত্র কোরআন এবং হাদিসের আলোকে একজন সফল মুমিনের গুণাবলী কেমন হবে তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

**আল্লাহ তালার নাম নিলে ভয়ে অন্তর কেঁপে উঠবেঃ
প্রকৃত ঈমানদার তো তারাই আল্লাহকে স্মরণ করা হলে যাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে৷ আর আল্লাহর আয়াত যখন তাদের সামনে পড়া হয়, তাদের ঈমান বেড়ে যায়, এবং তারা নিজেদের রবের ওপর ভরসা করে৷ (সুরা আনফাল ২)

**আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক না করা: শিরক সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন- ‘আল্লাহর সঙ্গে শরীক করো না, নিশ্চয়ই জেনে রেখো শিরক হচ্ছে অতি বড় জুলুম।’ (লুকমান ১৩)। শিরিক এত বড় জূলুম যা করলে একজন মুসলিমকে কাফের বানিয়ে জাহান্নাম পর্যন্ত পৌঁছে দেয়, অতএব প্রকৃত মুমিনরা এই জঘন্য অপরাধ থেকে বেঁচে থাকবে।

**ওয়াদা রক্ষা করা: ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়াদা ভঙ্গ করা মুনাফিকের আলামত, এটিও একটি কবিরা গুনাহ, মুমিন বান্দারা এই গুনাহ থেকে নিজেকে সতর্ক রাখবে, এবং প্রতিশ্রুতি দিলে তা রক্ষা করবে।

** মানুষকে সৎ কাজের উপদেশ এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিবে:
এখন তোমরাই দুনিয়ায় সর্বোত্তম দল৷ তোমাদের কর্মক্ষেত্রে আনা হয়েছে মানুষের হিদায়াত ও সংস্কার সাধনের জন্য ৷ তোমরা নেকীর হুকুম দিয়ে থাকো, দুষ্কৃতি থেকে বিরত রাখো এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো৷ (আলে ইমরান ১১০)। মুমিনের গুণাবলী মধ্যে এটি অন্যতম, নিজেও সৎ কাজ করবে এবং মানুষদেরকেও সর্বদাই সত্যের পথে আহবান করবে।

**ইয়াতিমের হক নষ্ট না করা: পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন,এতিমদেরকে তাদের ধন-সম্পদ ফিরিয়ে দাও৷ (সুরা নিসা ২)। এই সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে নির্দেশনা আসার পরেও বর্তমান সময়েও দেখা যায় অধিকাংশ এতিমদের সম্পদ পরিপূর্ণভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয় না, এটি বান্দার হক যারা বান্দার হক নষ্ট করবে আল্লাহ তাদেরকে কিয়ামতের ময়দানে ক্ষমা করবেন না। এই অপরাধের অপরাধী হবে তাদের জন্য রয়েছে পরকালীন জীবনে কঠিন শাস্তি।

** মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করবে না।

(আর রহমানের বান্দা হচ্ছে তারা) যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং কোন বাজে জিনিসের কাছ দিয়ে পথ অতিক্রম করতে থাকলে ভদ্রলোকের মত অতিক্রম করে যায়৷ (ফুরকান ৭২)। মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করা সামাজিক এবং ধর্মীয় অপরাধ, কারণ মিথ্যা সাক্ষী দ্বারা নির্দোষ ব্যক্তির উপর করা জুলুম হয়, পক্ষান্তরে দোষী ব্যক্তি শাস্তি থেকে বেঁচে যায় এতে দোষী ব্যক্তির সামাজিক এবং ধর্মীয় অপরাধের প্রবণতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। অতএব, প্রকৃত মুমিন মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান থেকে নিজেকে বিরত রাখবে।

**পিতা-মাতার অবাধ্য হবে না : মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করার জন্য মহান আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে পবিত্র কোরআনে মুমিনদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা এসেছে, তাই যারা ঈমান আনবে এবং নেক আমল করবে তারা কখনোই পিতা-মাতার প্রতি অবাধ্য হবে না। বরং তাদের হক পরিপূর্ণভাবে আদায় করবে, এবং তাদের প্রতি সদয় হবে।

**নির্দিষ্ট সময়ে মধ্যে পরিপূর্ণ যাকাত আদায় করা: যাকাত হল ইসলামের সেতুবন্ধন, এটি গরীবদের অধিকার, যাকাত কোন ধনীদের করুনা নয়, বরং আল্লাহ্ পাকের পক্ষ থেকে ধনিদের জন্য বিশেষ নেয়ামত, যাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম একটি ফরজ বিধান, এটি সামর্থ্যবানদের উপর আল্লাহ তাআলা ফরজ করেছেন, এবং সালাতের পরে যাকাতের উপর মহান আল্লাহ তা’আলা গুরুত্বারোপ করেছেন, প্রকৃত মুমিনের উপর যাকাত ফরজ হলে, তা যথাযথ সময়ে পূর্ণ করবে ।

**হালাল রুজি ভক্ষণ কর: হালাল খাওয়া সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন, তোমরা হালাল খাও, এবং নেক আমল কর(মুমিনূল৫১)। অত্র আয়াতে নেক আমলের পূর্বে হালাল খাবার কথা এসেছে, মুফাসসিরীনে কেরাম অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন ইবাদত ও নেক আমল কবুল হওয়ার জন্য হালাল উপার্জন শর্ত, তাই হালাল খাওয়ার কথা আগে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি উপার্জন হারাম হয়,এবং খাওয়া হালাল না হয় তবে কোন নেক আমল আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। তাই মুমিনরা নেক আমলের পূর্বে বৈধ উপার্জন করবে।

**দ্বীনি এলেম শিক্ষা করা: একজন মুসলমানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো সে নিজে এলেন শিখবে, এবং তদনুযায়ী আমল করে জান্নাতের পথ সুগম করবে , ইলমে দ্বীন শিক্ষা করা সকল নর এবং নারীর উপর ফরজ। হাদীস শরীফে এসেছে ,হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

যে কেউ ইলমের খোঁজে কোনো পথে চলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। -মুসনাদে আহমদ ১৪/৬৬। মুমিনের গুণাবলী মধ্যে এটি থাকবে অন্যতম।

**সময়ের গুরুত্ব দেওয়া: আল্লাহর দেওয়া অসংখ্য নেয়ামতের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ামত হলো “সময়”। কেয়ামতের মাঠে বান্দাকে কয়েকটি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে , সেই প্রশ্নগুলোর মধ্যে একটি প্রশ্ন থাকবে, আল্লাহর দেওয়া সময় তুমি কোন কাজে ব্যবহার করেছো?
অতএব প্রকৃত মুমিন বান্দারা অযথা সময় নষ্ট না করে সময়কে যথাযথ মূল্যায়ন করবে।

**নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়: আল্লাহর দেওয়া অসংখ্য নিয়ামত আমরা ভোগ করি, জীবনের প্রতিটি সময় কোন না,কোন নেয়ামতের মধ্যেই ডুবেই থাকি, আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া পৃথিবীতে এক সেকেন্ড থাকার ক্ষমতা আমাদের নেই। তাই মুমিন বান্দারা সর্বদাই আল্লাহর নেয়ামতের শোকর আদায় করবে।

**সত্য ও ন্যায়ের পথে নির্ভীক : মুমিনরা কখনোই আল্লাহ ব্যতীত কাউকে ভয় করবে না। সর্বদাই সত্য কথা বলবে এবং ন্যায়ের পথে থাকবে অবিচল।

**কেবল মাত্র মুমিনদেরকেই বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে।
মু’মিনরা যেন ঈমানদারদের বাদ দিয়ে কখনো কাফেরদেরকে নিজেদের পৃষ্ঠপোষক, বন্ধু ও সহযোগী হিসেবে গ্রহণ না করে৷ যে এমনটি করবে, আল্লাহর সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই৷ তবে হ্যাঁ, তাদের জুলুম থেকে আত্মরক্ষার জন্য তোমরা যদি বাহ্যত এ নীতি অবলম্বন করো তাহলে তা মাফ করে দেয়া হবে৷কিন্তু আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর নিজের সত্তার ভয় দেখাচ্ছেন আর তোমাদের তাঁরই দিকে ফিরে যেতে হবে৷ (আলে ইমরান ২৮)

**অন্যায় ভাবে কাওউকে হত্যা করবে না : আল্লাহ যে প্রাণকে মর্যাদা দান করেছেন ন্যায় সংগতভাবে ছাড়া তাকে ধ্বংস করো না৷(আনআম ১৫১)

**প্রকৃত মুমিনরা যা কখনোই মিথ্যা ওয়াদা এবং খেয়ানত করবে না। কারণ এ দুটি হল মুনাফিকের আলামত। অতএব,মুমিন বান্দারা সবসময় এ দুটি কবিরাগূনাহ থেকে নিজেকে সতর্ক রাখবে। এছাড়াও প্রকৃত মুমিনের অসংখ্য গুণাবলী রয়েছে। মোটকথা একজন মুমিন সব সময় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকবে, এবং আল্লাহর দেওয়া অর্পিত দায়িত্ব কে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করবে। অতএব, আল্লাহর রেজামন্দি এবং নৈকট্য লাভ করার জন্য জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে রাসূল সা. এবং সাহাবায়ে কেরামদের আদর্শিক জীবনকে অনুসরণ করতে হবে, তবে একজন মুসলমান নিজেকে প্রকৃত মুমিন হিসেবে গন্য করতে পারবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, বি,এ অনার্স (ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ) চাঁদপুর সরকারি কলেজ।

একই রকম খবর