সাংবাদিক নেতা ইকরাম চৌধুরীর স্মরণে স্মৃতিচারণ

>>>>>>>>>>>>>>>ইকবাল হোসেন পাটওয়ারী>>>>>>>>>>>>>

তুমি রবে নিরবে, হাজারো মানুষের হৃদয় জুড়ে। কী বন্যা, কী ঝড়, কী নদী ভাঙন, কী কৃষকের দুর্দশা! কোথায় দৌঁড়ে যাওনি তুমি! পেশার তাগিদে, নেশায় পেয়ে দৌঁড়ে গিয়েছিলে সর্বত্র। সাংগঠনিক দৃঢ়তায় চাঁদপুর প্রেসক্লাবকে করেছিলে একটি একক ঐক্যের প্রতীক। সভাপতি ছিলে, সাধারন সম্পাদক ছিলে এবং না ফেরার দেশে চলে গেলে ঐ সম্মান নিয়েই।

কিন্তু আমি তোমার এতো কাছের মানুষ হওয়ার সুবাদে দেখিনি সেই পদ নিয়ে ছিলো না তোমার দম্ভোক্তি, অহংকার, অহংবোধ। আর সেই বৈশিষ্ট্যগুলো থাকুক না আমাদের কাছে? তোমার অকাল মৃত্যু কিছুতেই আমি/ আমরা মেনে নিতে পারিনি! বিশেষ করে আমরা যারা তোমার কাছে কলম ধরা শিখেছি, তারা কী এই বেদনা সহ্য করতে পারবো ?

হ্যাঁ যাকে উদ্দেশ্য কথাগুলো আমি বলছি, তিনি ইকরাম চৌধুরী। চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি। দৈনিক চাঁদপুর দর্পণের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও প্রকাশক। আজ তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। দিন মাস গুনতে গুনতে চলে গেলো দু’টো বছর! মাত্র ৫৪ বছর বয়সে তাঁকে হারিয়েছি! বাঁচার আকুতি ছিলো, কিন্তু সব আয়োজন করেও আমরা তাঁকে বাঁচাতে পারিনি।

কুমিল্লা পলিটেকনিক্যালে লেখাপড়ার সময়ই সাংবাদিকতা শুরু করেছিলেন ইকরাম ভাই । পড়াকালিন সময়ে নিজের পছন্দের মানুষটিকে বিয়ে করলেন। ২ভাইকে ডিঙিয়ে বিয়ে করার অপরাধে তাঁকে ঘরে জায়গা করে নিতে দারুণ বেগ পেতে হয়েছে। পড়াশুনা শেষ করে একেবারে পেশা হিসাবেই নিয়ে নিলেন সাংবাদিকতাকে।

সরকারি চাকরি পেয়েও তা ছেড়ে দিলেন! সাংবাদিকতার নেশা তাকে পুরোটা পেয়ে গেলো। কখনো হেটে, কখনো সাইকেলে চড়ে তার সাংবাদিকতা। একসময় এসে অনেক কষ্টার্জিত উপার্জনে মটর সাইকেল কিনলেন। আর সে যাত্রাতেই আমি হই তাঁর কাছের মানুষ। আমাকে সে তৈরি করবে-এই ছিলো তাঁর পণ। অবশেষে তিনি সফল হয়েছেন।

চাঁদপুর প্রেসক্লাবের মেম্বার যখন ৭কি ৮, তখন ইকরাম ভাই ক্লাবের সদস্যপদ লাভ করেন। তারই ২/৩ বছরের মধ্যে আমাকে, জনকণ্ঠের জালাল চৌধুরী, এটিএন বাংলার পার্থনাথ চক্রবর্তী, ভোরের কাগজ ও দেশ টিভির লক্ষন চন্দ্র সূত্রধর, মুনীর চৌধুরী, শরীফ চৌধুরীকে মেম্বার করে নিলেন। তাঁর উদ্দেশ্যই ছিলো-চাঁদপুর প্রেসক্লাব হবে প্রবীন নবীনের সেতুতে গড়া একটি প্রতিষ্ঠান!

জীবনের শেষ মুহুর্তটুকু তিনি তা পেরেছেন। সাংবাদিকতার বৃহৎ ঐক্যের খাতিরে তিনি আপোস করেছেন অনেক কিছুতে, মেনে নিয়েছেন অনেক ঘাত-প্রতিঘাত! তাঁর এই দৃঢ়তার কারণে চাঁদপুরে সাংবাদিকদের একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান হিসাবে চাঁদপুর প্রেস ক্লাব একটি প্রতিষ্ঠান হিসাবে আজও দাঁড়িয়ে আছে ! যে প্রেসক্লাবে মেম্বার ছিলো ১০এর নীচে, আজ সেই প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য ৭৫ এর মতো! আছেন আজীবন এবং সম্মানিত সদস্যেরা।

চাঁদপুর প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কামরুজ্জামান চৌধুরী। মরহুম কামরুজ্জামান চৌধুরী, প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ হোসেন স্যারকে বহুবার বলতে শুনেছি-ইকরাম তুমি পারবে! সাবেক সভাপতি এড. ইকবাল বিন বাশার ভাইয়ের সাথে টানা তিনবার তিনি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

আর সেই তিনবারই আমি ছিলাম সাংগঠনিক সম্পাদক অভাব-অনটনের মধ্যে দিয়ে তাঁর সাংবাদিকতার জীবন কাটেনি, তা বলবো না, কারণ আমি খুব কাছে ছিলাম তো!

একসময় বিসিকে চাকরি পেলেন। করলেন কয়েক বছর। প্রকৌশলী। এর মাঝেই লুকিয়ে চলতো ধুমছে সাংবাদিকতা।

বিসিক কর্তৃপক্ষের কাছে ধরাও পড়লেন। তারা বল্লো-না এভাবে করলে ১০০% রেভিনিওতে ( সরকারি) চাকরি করা যাবে না। আমায় বলতো ইকবাল আমি কি করবো বলো! আমি বলতাম চাকরি এবং অবশ্যই চাকরি! না, আমার কথা নেশার কাছে পরাস্ত হলো! চাকরি ছেড়েই দিলেন।

১৯৯৯ সালে নিজেই পত্রিকা বের করলেন-দৈনিক চাঁদপুর দর্পণ। সাথী করলেন আমাকে, জালাল চৌধুরী, ফনীভূষন চন্দ,।লক্ষ্মণ চন্দ্র সূত্রধর, পার্থনাথকে। যুক্ত হলো সোহেল রুশদী, শেখ মহীউদ্দীন রাসেল, এসটি শাহদাত, প্রয়াত আজিজ ফারুকী, সুজনসহ আরো বেশ ক’ জন।

যুদ্ধ শুরু হলো নতুন। আদর্শিক আর অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে রাখা তখন ইনকিলাব ছেড়ে যুক্ত হলেন যুগান্তরে। এরই মধ্যে ঢুকলেন চ্যানেল আইতে। দু’টো পয়সা পাওয়া শুরু করলেন সেখান থেকে। কিন্তু সে পয়সার অর্ধেকই ঢালতেন লস প্রকল্প চাঁদপুর দর্পনে। তাঁকে নিয়ে বলা শেষ করা যাবে না।

একজন আদর্শিক মানুষ ছিলেন তিনি। আমি এমন একজন অভিভাবক হারিয়েছি যা কখনোই পূরণ হওয়ার না। চাঁদপুর প্রেসক্লাবও হারিয়েছে অভিভাবকত্বের একটা বড় জায়গা।

সারা জীবনের আফসোস! তাঁকে বাঁচাতে পারিনি। তবে তৈরি ছিলাম চিকিৎসার খরচ নিয়ে। বিদেশ যাবেন তাও একরকম ঠিক। কিন্তু না, তার আগেই বিদায় নিলেন।

তবে তৃপ্তি এখানে, ইকরাম চৌধুরীর চিকিৎসার্থে আমাদের কিছু নিকট আত্মীয় স্বজন, ইকরাম ভাইয়ের দূরের কাছের সুহৃদরা, শিক্ষকরাসহ অনেকে। সেই অর্থের ১০ লাখ ৮ হাজার টাকায় তাঁর ১৫ বছরের বাড়ির ব্যাংক ঋন সম্পুর্ন পরিশোধ করে দিয়েছি, এছাড়া বাকি টাকা আমরা বাকি ১০লাখ টাকা সোনালি ব্যাংক, চাঁদপুর ট্টেজারি শাখায় ডিপোজিট করেছি। ইকরাম চৌধুরী কল্যাণ ট্টাস্ট গঠন করেছি।

সে টাকার লভ্যাংশ থেকে ইকরাম ভাইয়ের একমাত্র মেয়ে ইায়ানাকে তাঁর বাবার মৃত্যুর পরের মাস থেকেই লেখা পড়ার খরচ হিসাবে প্রতিমাসে ৩ হাজার হাজার টাকা করে জুন-২২ পর্যন্ত ঐ হারে টাকা দিয়ে আসছি।

ক’ জন সাংবাদিককে চিকিৎসায় আর্থিক সাহায্য করেছি। আমাদের ১৮সদস্য ট্রাস্টের নিয়মানুযায়ী এই ট্রাস্টের অর্থ অসহায় সাংবাদিকদের চিকিৎসা ব্যয়ে খরচ করবো। শুধুই চিকিৎসাখাতে এই ট্রাস্টের টাকা ব্যয় করা হবে। জালাল ভাইকে এর আহবায়ক এবং আমি এর সদস্য সচিব এবং ইকরাম ভাইয়ের সহধর্মিণী শ্রদ্ধেয় ভাবী, তাঁর ভাই শরীফ চৌধুরীসহ আমরা ১৮ জন এই ট্রাস্টে রয়েছি।

প্রয়াত ইকরাম চৌধুরীর সারা জীবনের স্বপ্ন ছিলো-সাংবাদিকদের কল্যাণ তিনি করবেন। আজ তাঁর স্নেহভাজন আমি, জালাল চৌধুরীসহ চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সদস্যরা মিলে যা করেছি, আল্লাহ যেন আমাদের তাঁর কাজগুলো করার সুযোগ দেন। আপনারা যারা তাঁর চিকিৎসার্থে এগিয়ে এসেছেন তাদের প্রতি রইলো অসীম কৃতজ্ঞতা।

আপনারা, শুধু দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন আমাদের ভালো রাখে।

লেখক পরিচিতি:
ইকবাল হোসেন পাটওয়ারী
সাবেক সভাপতি চাঁদপুর প্রেসক্লাব
সম্পাদক ও প্রকাশক ,দৈনিক চাঁদপুর প্রতিদিন ,
চাঁদপুর জেলা প্রতিনিধি দৈনিক  সমকাল ।
তাং ৮.৮.২০২২ খ্রি:

 

একই রকম খবর